মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-লুটের পর গুঁড়িয়ে দিলো দুর্বৃত্তরা
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে রাতের আঁধারে অতর্কিত হামলা, ভাঙচুর, ব্যাপক লুটপাট ও বুলডোজার দিয়ে পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ১০ কাঠা মূল্যবান জমি জবরদখল করার সুদূরপ্রসারী ও কুচক্রী উদ্দেশ্যে এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে বলে ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্ব ও দীর্ঘদিনের চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এলাকার হাজারো দরিদ্র মা ও শিশুর জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসেবা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান কর্মসূচি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জনের একটি সংঘবদ্ধ মুখোশধারী দুর্বৃত্তদল মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে চড়াও হয়।
হামলাকারীরা অত্যন্ত সুকৌশলে সেন্টারে কর্তব্যরত দুজন নিরাপত্তাকর্মীকে বেঁধে জিম্মি করে ভেতরে প্রবেশ করে এবং দ্রুত পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর তারা ক্লিনিকের ভেতরে বর্বরোচিত তাণ্ডব চালিয়ে সমস্ত মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, ফাইলপত্র ও আসবাবপত্র লুট করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, মূল তাণ্ডবের পাশাপাশি দুর্বৃত্তরা ভারী যন্ত্রপাতি ও বুলডোজার বা ভেকু ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনাটি মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গুঁড়িয়ে দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। এমনকি প্রতিষ্ঠানের ভেতরের বড় বড় গাছপালাও নির্দয়ভাবে উপড়ে ফেলা হয়। তাণ্ডব শেষে অবৈধ দখল পাকাপোক্ত করতে সীমানা প্রাচীরের ভেতর সম্মাননা দোকানদার সমিতি লিমিটেড বা সমমনা দোকানদার সমিতি লি. নামের একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া সেন্টারের পেছনের দেয়ালসংলগ্ন রাস্তার পাশে থাকা ১৭টি ভ্রাম্যমাণ দোকানের মালিকদের মাত্র ১০ মিনিট সময় বেঁধে দিয়ে তড়িঘড়ি করে নিজেদের মালামাল সরিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে যে এই বর্বরোচিত হামলা, ভাঙচুর ও সর্বগ্রাসী লুটপাটের ফলে প্রায় দেড় কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। লুট হওয়া উল্লেখযোগ্য ও দামি মালামালের মধ্যে রয়েছে নগদ প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন।
এছাড়াও সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহকৃত মূল্যবান ইপিআই টিকা, টিকাদানের সরকারি রেজিস্টার ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক নথি, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ভ্যাকসিন লুট করা হয়েছে। হামলাকারীরা একটি জেনারেটর, তিনটি ডিপ ফ্রিজ ও সাধারণ ফ্রিজ, তিনটি এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, তিনটি স্টিলের আলমারি, পাঁচটি স্টিলের ফাইল কেবিনেট, ল্যাবরেটরির বিভিন্ন অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও রিএজেন্ট, দুটি টেলিভিশন, দুটি কম্পিউটার, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার এবং প্রয়োজনীয় চেয়ার-টেবিলসহ অন্যান্য সমস্ত আসবাবপত্র জোরপূর্বক নিয়ে গেছে বা ভেঙে ফেলেছে।
আরও পড়ুন: ঢাকায় ছেলের দেওয়া আগুনে মারা গেলেন বাবা
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার গণমাধ্যমকে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানান যে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি মিরপুর এলাকার হতদরিদ্র, প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চালিয়ে আসছে। এটি ছিল ওই অঞ্চলের হাজারো নারী ও শিশুর আস্থার একটি প্রধান আশ্রয়স্থল। বিশেষ করে, ঘটনার পরদিন শুক্রবার সকাল থেকেই কেন্দ্রটিতে দেশব্যাপী সরকারি হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন একযোগে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আকস্মিক এই ধ্বংসযজ্ঞের কারণে নির্ধারিত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি ও সাধারণ চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, যা এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক, ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
এই নজিরবিহীন ও বর্বরোচিত ঘটনার পর শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া দুইটার দিকে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বাদী হয়ে রাজধানীর শাহ আলী থানায় একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেন। দায়েরকৃত মামলায় স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি হানিফ মিয়ার নাম সুনির্দিষ্টভাবে প্রধান আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
আসামিদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশ, পরিকল্পিত চুরি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং দেড় কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে ডিএমপির শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যমকে জানান যে পুলিশ খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং উৎসুক জনতাকে সেখানে জড়ো হতে দেখেছে। মামলা রুজু হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গভীরভাবে তদন্ত চলছে এবং এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
এদিকে, অভিযুক্ত স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন যে এই ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ; এমনকি তিনি নাকি জানেনই না সেখানে কী ঘটেছিল।
এই নৃশংস হামলা, ভাঙচুর ও জবরদখলের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে শুক্রবার বিকেলে রাড্ডা সেন্টারের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে একটি প্রতিবাদী মানববন্ধনে অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে এই হামলা কেবল একটি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত নয়, এটি দেশের অবহেলিত দরিদ্র ও দুস্থ মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারের ওপর সরাসরি চরম আঘাত।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে অত্যন্ত জোরালোভাবে দুটি প্রধান ও দাবি জানানো হয়েছে। প্রথমত, হামলায় সরাসরি জড়িত ও নেপথ্যের মূল মদদদাতাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের মাধ্যমে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদান করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আধুনিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণপূর্বক এখানকার জনকল্যাণমুখী স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম অবিলম্বে পুনরায় চালু করতে হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








