গ্যাস সংকটে গাজীপুরের ২০% কারখানায় টানা ছুটি
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটের প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে। প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে শত শত শিল্পকারখানার জন্য। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে জেলার প্রায় ২০ শতাংশ শিল্পকারখানায় টানা চার দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ। কোথাও কোথাও পাঁচ দিনের ছুটিও দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই হাজারো পোশাকশ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
বুধবার (০৫ আগস্ট) সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা গেছে ঈদের সময়ের মতো ঘরমুখো মানুষের ঢল।
পরিবহন সংকট, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিল্পমালিকদের মধ্যে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কম। শুরুতে কারখানা মালিকরা উৎপাদন সচল রাখতে নানা বিকল্প কৌশল গ্রহণ করেন। কোথাও কিছু উৎপাদন লাইন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়, কোথাও সীমিত সংখ্যক মেশিন চালানো হয়, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান রাতের শিফটে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিতে এবং সরকারি ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত ছুটি সমন্বয় করতে বাধ্য হয়। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়ায় একের পর এক শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক কারখানা কার্যক্রম সীমিত করেছে।
শিল্প পুলিশ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং শিল্পমালিকদের তথ্যমতে, বর্তমানে জেলার প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশ কারখানায় চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং, ডাইং ও ওয়াশিং খাতের। কিছু কারখানায় উৎপাদনের একটি অংশ সচল রাখা হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, এক দিনের সরকারি ছুটির সঙ্গে অতিরিক্ত ছুটি যোগ করে জেলার অনেক কারখানায় চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ২০ শতাংশ কারখানা এই ছুটির আওতায় এসেছে। ছুটি পেয়ে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
বুধবার সকালে সরেজমিনে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ত্রিমোড়, কোনাবাড়ী, চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া, সফিপুরসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, শত শত নয়, হাজার হাজার শ্রমিক বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। দূরপাল্লার বাসের তুলনায় যাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক বাসস্ট্যান্ডে নারী ও শিশুদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা।
ঘরমুখো যাত্রীরা অভিযোগ করেন, পরিবহন সংকটকে পুঁজি করে কিছু অসাধু পরিবহনচালক স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায় করছেন। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই অনেকে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন। এতে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সিরাজগঞ্জগামী এক পোশাককর্মী হাফিজুর রহমান বলেন, চার দিনের ছুটি পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু চন্দ্রায় এসে ঈদের মতো ভিড়ের মধ্যে পড়েছি। বাসও কম, আবার ভাড়াও অনেক বেশি নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন: তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপরে, প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল
গোমতী টেক্সটাইলের শ্রমিক কফিল উদ্দিন বলেন, কাজ না থাকলে কয়েক দিনের জন্য বাড়ি যেতে পারাটা ভালো। তবে দ্রুত গ্যাস সংকটের সমাধান না হলে আবার কাজে ফিরেও একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।
হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, যাত্রী ও যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে গেলেও মহাসড়কে বড় ধরনের যানজট সৃষ্টি হয়নি। তবে চন্দ্রা, সফিপুর, কোনাবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় যাত্রী ওঠানামার কারণে যানবাহন থেমে থেমে চলেছে।
নাওজোর হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাফর আলী খান বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাজীপুর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি। এখানে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, নিটিং, ডাইং, ওয়াশিং, সিরামিক, ওষুধ, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা পরিচালিত হয়।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অঞ্চলের উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় অর্থনীতিতে নয়, দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও পড়তে পারে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গাজীপুরে দৈনিক প্রায় ৫৫০ থেকে ৫৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে, যা মোট চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ। এই ঘাটতির কারণে শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ বজায় রাখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে সকাল ও দিনের বেলায় উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হচ্ছে।
গাজীপুরে তিতাস গ্যাসের সিস্টেম অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখার ব্যবস্থাপক মো. সাইফুজ্জামান বলেন, বর্তমানে কালিয়াকৈর, শ্রীপুর ও টঙ্গী বিসিক শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে। গ্যাস সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি কার্যক্রম চলমান থাকলেও সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
শিল্পমালিকরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্টাইলিশ গার্মেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, অব্যাহত গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক ক্রেতাই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
পিএন কম্পোজিট কারখানার ব্যবস্থাপক তাপস পালও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত বড় ধরনের চাপে পড়বে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, গ্যাস সংকট সাময়িকভাবে শ্রমিকদের অতিরিক্ত ছুটির সুযোগ তৈরি করলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে অনেক বেশি গুরুতর। উৎপাদন কমে গেলে কর্মঘণ্টা হ্রাস, ওভারটাইম কমে যাওয়া, রপ্তানি আদেশে বিলম্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে যদি পরিবহন সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকে, তবে দেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের নিম্নচাপ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ী নেতারা। বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়া, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
এ অবস্থায় শিল্পমালিকদের অভিন্ন দাবি, শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্প দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








