News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৩০, ১৮ মার্চ ২০২৬
আপডেট: ১৯:৩০, ১৮ মার্চ ২০২৬

মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ইরান: সংঘাত, স্বার্থ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ইরান: সংঘাত, স্বার্থ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের যে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (Axis of Resistance) গড়ে তুলেছিল তেহরান, সাম্প্রতিক ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সামরিক অভিযানের মুখে তা আজ এক নজিরবিহীন অস্তিত্ব সংকটে। পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর প্রতিবেশী সুন্নি প্রধান আরব দেশগুলোর ওপর সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দ্বিমুখী সংকটে ইরান এখন মুসলিম বিশ্ব থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, তথাকথিত ‘প্যান-মুসলিম’ সংহতির চেয়ে আরব দেশগুলোর কাছে এখন নিজস্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই প্রধান অগ্রাধিকার।

আদর্শিক লড়াই বনাম অস্তিত্বের সংকট
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান নিজেকে মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক এবং ফিলিস্তিন ইস্যুর প্রধান রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে আসলেও বাস্তবে আরব বিশ্বের সাথে তাদের দূরত্ব ঘোচেনি। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ফার্সি ভাষা ও শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা সুন্নি প্রধান আরব দেশগুলোর কাছে সবসময়ই একটি অস্বস্তির কারণ ছিল। দীর্ঘদিনের এই সাম্প্রদায়িক বৈপরীত্য ও পারস্পরিক অবিশ্বাস এখন যুদ্ধের ময়দানে স্পষ্ট।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ফ্যাব্রিস ব্যালানশের মতে, শিয়াদের সঙ্গে সুন্নিদের ঐক্য সাধন বাস্তবে সম্ভব নয়, বিশেষত যখন ইরান নিজেই প্রতিবেশী সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর ওপর হামলা চালায়। এমন পরিস্থিতিতে তাদের কাছ থেকে সংহতি আশা করা অবান্তর।

কৌশলগত ভুল ও আরব দেশগুলোর অনীহা
২৮শে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর ওপর যে পাল্টা আঘাত হেনেছে, তাকে তেহরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসের পবিত্রতা লঙ্ঘন করে এই হামলা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে যুদ্ধে টেনে আনার হুমকি আরব দেশগুলোর জাতীয় স্বার্থে সরাসরি আঘাত হেনেছে। এর ফলে কাতার বা ওমানের মতো দেশগুলো, যারা অতীতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে, তারাও এখন পিছু হটছে।

‘ভিশন ২০৩০’ বনাম বিপ্লবী আদর্শ
সৌদি আরবসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের 'ভিশন ২০৩০' প্রকল্প দেশটিকে একটি আধুনিক পর্যটন ও বিনিয়োগ কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যে পরিচালিত। এই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার জন্য অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।

অন্যদিকে, আরব আমিরাতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নাজাত আল-সায়েদ-এর মতে, ইরান এখনো একটি ‘বিপ্লবী আদর্শের রাষ্ট্র’ হিসেবেই রয়ে গেছে যা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে ব্যর্থ হয়েছে। এই আদর্শিক অনড়তা এবং সশস্ত্র মিলিশিয়াদের (হেজবুল্লাহ, হুথি ও হামাস) অর্থায়ন আরব দেশগুলোকে ইরানের বদলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বলয়ের দিকে ধাবিত করছে।

ধসে পড়া ‘প্রতিরোধের অক্ষ’
এক সময় লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধে এই নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে:

লেবানন: ইসরায়েলি অভিযানে হেজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্ব প্রায় নির্মূল।

সিরিয়া: দীর্ঘদিনের মিত্র বাশার আল-আসাদের পতন এবং রাশিয়ায় আশ্রয় গ্রহণ তেহরানকে ভূ-রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে।

ফিলিস্তিন: হামাসের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় ইরান তার অন্যতম প্রধান কৌশলগত অস্ত্র হারিয়েছে।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ও নতুন আঞ্চলিক মেরুকরণ
২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তির পর সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কোর মতো দেশগুলো ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। এই দেশগুলোর কাছে এখন সাধারণ শত্রু হিসেবে ইসরায়েলের চেয়ে ইরানই বেশি প্রকট। এমনকি সৌদি আরবও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক 'আয়রন ডোম' বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে। ফলে ইরানকে কেন্দ্র করে যে আঞ্চলিক মেরুকরণ শুরু হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি তেহরানের প্রতিকূলে।

ভবিষ্যৎ কী?
বিশ্লেষকরা একবাক্যে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সেই একক আধিপত্যের দিন শেষ হয়ে আসছে। আস্থার যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার জন্য প্রায় অসম্ভব। মুসলিম বিশ্বের অনীহা এবং পশ্চিমাদের ক্রমবর্ধমান চাপ ইরানকে এক দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইরানকে পুনরায় আগের অবস্থানে ফিরতে বহু সময় লাগবে, আর এই অন্তর্বর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো কেবল নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার দিকেই মনোনিবেশ করবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়