News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:৫৮, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫

টার্গেট কিলিংয়ের নেপথ্যে সুব্রত বাইনের কন্যা

টার্গেট কিলিংয়ের নেপথ্যে সুব্রত বাইনের কন্যা

ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিক গুপ্ত হত্যার পরিকল্পনার তথ্য উদ্ঘাটন করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, এই পরিকল্পনার সঙ্গে অন্তত দেড়শ প্রশিক্ষিত ক্যাডার জড়িত, যারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ক্যাডারদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুবাইতে অবস্থানরত পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান এবং কারাগারে আটক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে মোহাম্মদ ফতেহ আলী। দুবাই ও কারাগারে অবস্থান করেই তারা পাশের একটি রাষ্ট্র এবং দেশের একটি রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে সমন্বিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। আর দেশের ভেতরে বসে ক্যাডারদের সরাসরি দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন সুব্রত বাইনের কন্যা সাবিনা ইয়াছমিন সিনথিয়া ওরফে সিনথিয়া বীথি।

সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটকের সামনে থেকে সিনথিয়াকে আটক করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। গ্রেফতারের পর তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা আধুনিক ডিজিটাল ডিভাইস জব্দ করা হয়। এসব ডিভাইস থেকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ধার হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

র‍্যাব-১১-এর সিইও লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাত হোসেন জানান, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অনুরোধে সিনথিয়াকে কুমিল্লা থেকে হেফাজতে নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম জানান, র‍্যাবের কাছ থেকে হস্তান্তরের পর সিনথিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে টার্গেট কিলিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নায়ক শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ডিবি সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে সিনথিয়াকে আদালতে হাজির করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তাকে সরাসরি হাদি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার না দেখিয়ে হাতিরঝিলের আরিফ হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন গত ২৭ মে কুষ্টিয়া থেকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার হন। পরে রাজধানী থেকে তার সহযোগী শুটার আরাফাত ও শরীফকে গ্রেফতার করা হয়। একাধিক দফা স্থানান্তরের পর গত ৫ ডিসেম্বর তাকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়।

কারাগারে অবস্থান করলেও গোপন চিরকুটের মাধ্যমে তিনি কন্যা সিনথিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন। একপর্যায়ে ঢাকায় সুব্রত বাইনের ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে সিনথিয়ার হাতে চলে আসে। আন্ডারওয়ার্ল্ডে তিনি ‘গ্যাং মাদার’ হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকেন। একই সঙ্গে দুবাইয়ে অবস্থানরত জিসানের ক্যাডাররাও এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়।

পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পর সুব্রত বাইন গোপন বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেয়ে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ও পলাতক রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্যাডারদের দেশে পাঠিয়ে গুপ্ত হত্যার মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়।

পরিস্থিতি প্রকাশ্যে আসার পর নতুন কৌশল হিসেবে সামনে আনা হয় সিনথিয়াকে। একই সময়ে চুক্তিভিত্তিতে যুক্ত হন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। গোয়েন্দাদের মতে, পরীক্ষামূলকভাবে শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয় আদাবরের ছাত্রলীগ নেতা দাউদ ও আলমগীরকে, যারা সুব্রত বাইনের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত।

আরও পড়ুন: পরিবেশ বিধংসী ইটভাটার রমরমা বাণিজ্য, বেশির মালিক আ.লীগ নেতা

হাদি হত্যাচেষ্টার তদন্তে উঠে এসেছে একটি হিটলিস্ট, যেখানে আরও অন্তত ১০ জনের নাম রয়েছে। তালিকার অধিকাংশই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা। পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে জুলাই বিপ্লবের আরেক নায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যাহত করতে ভারতে অবস্থানরত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি গোষ্ঠী এই হত্যামিশনের নেপথ্যে কাজ করছে। এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক।

হাদি হত্যাচেষ্টার ঘটনায় পল্টন থানায় দায়ের হওয়া মামলায় প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ (দাউদ খান)। তার স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ ও বান্ধবী মারিয়া আক্তারকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। সীমান্ত পারাপারে সহায়তাকারী বেঞ্জামিন চিরান ও সীশলকে বিজিবি আটক করেছে।

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, বাবার অনুপস্থিতিতে সিনথিয়া পুরো অপরাধ নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্রবিন্দুতে তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তার ডিজিটাল ডিভাইস, কলরেকর্ড ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক এবং পলাতক রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, সিনথিয়া বীথি সুব্রত বাইনের তিন স্ত্রীর মধ্যে স্ত্রী লুসির বড় সন্তান। তার ভাইয়ের নাম তৌকির আলী রিপন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, এই গ্রেপ্তার শুধু একটি সন্ত্রাসী পরিবারের সদস্যকে আইনের আওতায় আনার ঘটনা নয়; বরং দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড, আন্তঃদেশীয় অপরাধ নেটওয়ার্ক এবং চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসী তৎপরতার গভীর যোগসূত্র উন্মোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়