ভারতকে ‘হ্যাঁ’ বলার আগে চার শর্ত বাংলাদেশের
ফাইল ছবি
বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বর্তমানে এক নতুন ও জটিল অধ্যায় তৈরি হয়েছে। গত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের কূটনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।
একদিকে আসামের বরনগর থেকে বিহারের কাটিহার পর্যন্ত ৭৬৫ কেভি হাইভোল্টেজ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বা করিডর স্থাপনে ভারতের নতুন তাগাদার বিপরীতে বাংলাদেশ কঠোর শর্ত ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অবস্থান নিয়েছে; অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নয়াদিল্লিতে আমন্ত্রণ জানানোর পর নানা কূটনৈতিক শর্ত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির মারপ্যাচে সেই সফর ঝুলিয়ে রেখেছে ঢাকা।
৭৬৫ কেভি বিদ্যুৎ করিডর ও বাংলাদেশের চার কঠিন শর্ত
ভারতের পক্ষ থেকে আসামের বরনগর থেকে বিহারের কাটিহার পর্যন্ত ৭৬৫ কেভি হাইভোল্টেজ পাওয়ার গ্রিড লাইন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে নেওয়ার জন্য জোরালো তাগাদা দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, কেবল ভারতের একতরফা সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নিজেদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হবে না। এই বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ বিভাগ যৌথভাবে বিশদ মূল্যায়ন করে চারটি সুনির্দিষ্ট শর্তের রূপরেখা তৈরি করেছে।
প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করতে হবে যে, ব্রহ্মপুত্র নদে কোনো ধরনের বাঁধ নির্মাণ করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এই সঞ্চালন লাইন দিয়ে প্রবাহিত করা হবে কি না। কারণ, ব্রহ্মপুত্রে উজানে বাঁধ দেওয়া হলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দ্বিতীয় শর্ত হিসেবে ঢাকা চাচ্ছে, এই করিডরের পাশাপাশি নেপাল ও ভুটান থেকে সস্তায় জলবিদ্যুৎ আমদানির জন্য একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আঞ্চলিক গ্রিড লাইন তৈরির সমান সুযোগ বাংলাদেশকে দিতে হবে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যে লাইন টানা হবে, সেখান থেকে বাংলাদেশ নিজে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ সরাসরি আমদানি ও ব্যবহার করতে পারবে, তার সুনির্দিষ্ট কোটা ও নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে এই লাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে সামগ্রিক অর্থনৈতিক লাভ ও ক্ষতির পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব বা কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস সম্পন্ন করতে হবে।
ঢাকা নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গত ৬ আগস্ট বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে বৈঠকে এই গ্রিড লাইন নির্মাণের বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। তবে বাংলাদেশ সরকার একক কোনো দেশের স্বার্থে কাজ না করে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান এই চার দেশের সমন্বয়ে একটি যৌথ আঞ্চলিক গ্রিড লাইন গঠনের প্রস্তাবের ওপর জোর দিচ্ছে। এর আগে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ দিল্লি সফর করে ভারতের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করে এসেছেন।
বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম মনে করেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত-নেপাল-ভুটানের সঙ্গে আঞ্চলিক গ্রিড সংযোগ জরুরি হলেও বাংলাদেশ যার কাছ থেকে সবচেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ পাবে, কেবল তার সঙ্গেই বাণিজ্যিক চুক্তিতে যাওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: ভারতের নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকার অনড়: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ভারতের সর্বোচ্চ আগ্রহ ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর ঘিরে জটিলতা
বিদ্যুৎ করিডরের বাইরে দুই দেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নয়াদিল্লিতে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে অনাস্থা ও দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল, তা কমিয়ে আনতে নতুন সরকারের সঙ্গে সরাসরি এবং নতুন ভিত্তির ওপর সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ঢাকায় তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই ভারতীয় পক্ষ থেকে এই সফর নিয়ে অত্যন্ত প্রকাশ্য উৎসাহ ও কূটনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে।
তবে ভারত যতই কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক কারণে এই সম্পর্ক পুনর্গঠন করতোক, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত সরকারের আশ্রয় দেওয়া এবং গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার অনুষ্ঠানে তার ভার্চুয়ালি রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ওই ঘটনার পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
ঢাকা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের এবং সাম্প্রতিক আন্দোলনসংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার সন্দেহভাজন আসামিদের দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হলে এই দ্বিপক্ষীয় সফর ফলপ্রসূ হতে পারে না।
ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও বাংলাদেশের কৌশলগত বহুমুখীনতা
ভারতের বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডগত ও কৌশলগত গুরুত্ব ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এবং ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সম্পর্ককে দীর্ঘকাল অনিশ্চয়তায় ঝুলিয়ে রাখা দিল্লির জন্যও কূটনৈতিকভাবে সুবিধাজনক নয়। বিশেষ করে, বর্তমান ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ কেবল ভারতের ওপর নির্ভরশীল না থেকে পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করায় ভারতের কৌশলবিদদের টনক নড়েছে। ঢাকা এখন তার বৈদেশিক নীতিতে সবার আগে বাংলাদেশ বা বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতি বাস্তবায়ন করছে, যেখানে সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক মর্যাদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে ২২-২৩ আগস্ট সম্ভাব্য সময় ধরে তারেক রহমানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রস্তুতি মোটামুটি চূড়ান্ত পর্যায়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত ২১ আগস্ট রাষ্ট্রপতির ভবন থেকে চেঞ্জ অব গার্ড বাতিলের বিভ্রান্তিকর প্রটোকল বার্তা এবং পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘটনা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী নিশ্চিত করেছেন যে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পলাতকদের প্রত্যর্পণ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি বা সদুত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এই সফর নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এছাড়া আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস (BRICS) আউটরিচ সেশনের একটি আলাদা বহুপক্ষীয় আমন্ত্রণও রয়েছে, যা বিমসটেকের সভাপতিত্বের সুবাদে এসেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় কোনোটি নিয়েই এখনো চূড়ান্ত সম্মতি দেননি।
সবমিলিয়ে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্ক এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক দশক ধরে চলে আসা একপাক্ষিক রাজনৈতিক নির্ভরতার দিন শেষ করে বাংলাদেশ এখন সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক চায়। ৭৬৫ কেভি বিদ্যুৎ করিডরের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ ও পরিবেশগত নিরাপত্তা রক্ষা এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুর সমাধান এই দুই মূল বিষয়ের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি ও কাঠামোগত রূপ।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








