প্রয়োজনে মিত্রদের পাশে না পেয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভ
ছবি: সংগৃহীত
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চলমান যুদ্ধের উত্তপ্ত আবহে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের অভিযানে মিত্ররা পর্যাপ্ত সহায়তা করতে ব্যর্থ হলে ন্যাটোর সামনে ‘খুবই খারাপ ভবিষ্যৎ’ অপেক্ষা করছে বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন।
প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমস-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জোটের বর্তমান কার্যক্রমকে একটি ‘একমুখী রাস্তা’ হিসেবে অভিহিত করে মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করেন।
তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মিত্রদের পাশে দাঁড়ালেও প্রয়োজনের সময় তারা একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে না।
সাক্ষাৎকারে তিনি বিশেষভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে হওয়া সত্ত্বেও ওয়াশিংটন সেখানে বিপুল সহায়তা দিয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, আমরা খুবই উদার ছিলাম। ইউক্রেন আমাদের থেকে অনেক দূরে, তবু আমরা তাদের সাহায্য করেছি। এখন দেখা যাক, তারা আমাদের সাহায্য করে কি না।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন, এই লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তাই তাদের দিতে হবে এবং সেখানে কোনো শর্ত আরোপ করা চলবে না। “যা কিছু প্রয়োজন সবই করতে হবে,” মিত্রদের উদ্দেশে এমন মন্তব্য করেন তিনি।
এই প্রসঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্যের প্রতিও তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাজ্যকে এক নম্বর এবং সবচেয়ে পুরোনো মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও যখন তিনি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান, তখন তারা সাড়া দেয়নি।
তার অভিযোগ, মার্কিন বাহিনী যখন প্রায় ইরানের বিপজ্জনক সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে ফেলেছে, তখন ব্রিটেন দুটি জাহাজ পাঠানোর প্রস্তাব দেয়।
ট্রাম্প এ প্রসঙ্গে ব্যঙ্গ করে বলেন, যুদ্ধ জয়ের পর নয়, জেতার আগেই সেই সহায়তা প্রয়োজন ছিল।
তার মতে, মিত্রদের এমন গড়িমসি ন্যাটোর প্রাসঙ্গিকতাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
আরও পড়ুন: নেতিবাচক খবর ছড়ালে লাইসেন্স বাতিল, ট্রাম্প প্রশাসনের হুমকি
এদিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ঘিরেও উত্তেজনা বাড়ছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে ইরান কার্যত এই প্রণালীর ওপর অবরোধমূলক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র মিত্র দেশগুলোর কাছে প্রণালিটি নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখতে সামরিক সহযোগিতা চাইছে। তবে ওয়াশিংটনের এই আহ্বানে ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশ সাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না।
এবিসি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অস্ট্রেলিয়ার পরিবহনমন্ত্রী ক্যাথেরিন কিং বলেন, অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে ওই অঞ্চলে প্রতিরক্ষা সহায়তা হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিমান মোতায়েন রেখেছে, বিশেষ করে সেখানে বসবাসকারী অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা বিবেচনায়। তবে প্রণালীতে নৌযান পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
একই অবস্থান নিয়েছে জাপান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী তেলবাহী জাহাজকে পাহারা দিতে নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠানোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, জাপান স্বাধীনভাবে কী করতে পারে এবং বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে কী করা সম্ভব তা আমরা খতিয়ে দেখছি।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে ওয়াশিংটন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে তাকাইচির। সেখানে ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে হরমুজ প্রণালি সংকটসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ উন্মুক্ত রাখতে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তিনি নতুন কৌশল নিতে পারেন।
তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে চলতি মাসের শেষ দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনিপিংয়ের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুক্তি হলো, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চীন ও ইউরোপের নির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি। তাই এই জলপথ নিরাপদ রাখা এবং সেখানে কোনো অঘটন না ঘটার দায়িত্বও তাদের নিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা, মিত্রদের অনাগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ সব মিলিয়ে ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








