News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:২৪, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ল্যানসেটের গবেষণা: গাজায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে

ল্যানসেটের গবেষণা: গাজায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে

ফাইল ছবি

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক একাধিক স্বাধীন গবেষণায়। 

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত এসব গবেষণা বলছে, ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত গাজায় কেবল ‘সহিংস মৃত্যু’র সংখ্যাই ৭৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। যা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্বপ্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।

‘গাজা মর্টালিটি সার্ভে’ শীর্ষক জনসংখ্যাভিত্তিক গৃহস্থালি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আনুমানিক ৭৫ হাজার ২০০ জন সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধের আগে প্রায় ২২ লাখ জনসংখ্যার গাজায় এ সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব ছিল ৪৯ হাজার ৯০ জন, অর্থাৎ স্বাধীন জরিপের পরিসংখ্যান প্রায় ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ৭১ হাজার ৬৬২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ৪৮৮ জনের মৃত্যুর তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, জানুয়ারিতে দেশটির সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, গাজায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এমন হিসাব তারা গ্রহণ করছেন।

স্বাধীন জরিপে ২ হাজার পরিবারের মোট ৯ হাজার ৭২৯ জন সদস্যের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। 

গবেষণার প্রধান লেখক, লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মাইকেল স্প্যাগাট বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য সাধারণত নির্ভরযোগ্য হলেও হাসপাতাল ও প্রশাসনিক অবকাঠামো ভেঙে পড়ায় প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কম প্রতিফলিত হয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় পরিসংখ্যানভিত্তিক ‘ক্যাপচার-রিক্যাপচার’ পদ্ধতি ব্যবহার করে যুদ্ধের প্রথম নয় মাসে ৬৪ হাজার ২৬০ জন মৃত্যুর অনুমান করা হয়েছিল। নতুন জরিপ সরাসরি পরিবারভিত্তিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে সেই অনুমানকে আরও বিস্তৃত ভিত্তি দিয়েছে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো সহিংসতার বাইরের অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যাও তুলে ধরা হয়েছে। জরিপে ১৬ হাজার ৩০০টি অসহিংস মৃত্যুর উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে ৮ হাজার ৫৪০টি মৃত্যু অবরোধ, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধস ও জীবনযাত্রার অবনতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

আরও পড়ুন: গাজায় থার্মোবারিক বোমায় মুহূর্তে ‘বাষ্পীভূত’ ২,৮৪২ ফিলিস্তিনি

নিহতদের জনমিতিক চিত্রেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। নারী, শিশু ও বয়স্ক মিলিয়ে মোট নিহতের ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ, যা বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘাতের গভীর প্রভাবের ইঙ্গিত বহন করে। গবেষকদের মতে, একাধিক স্বাধীন পদ্ধতিতে যাচাই করা এই ফলাফল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যকে ন্যূনতম সীমা হিসেবে বিবেচনার যৌক্তিকতা জোরালো করে।

প্রাণহানির পাশাপাশি আহতের সংখ্যাও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ইক্লিনিক্যালমেডিসিনে প্রকাশিত আরেক বহুমাত্রিক গবেষণায় ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট আহতের সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজার ২০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয় এবং গাজার আল-শিফা হাসপাতালের গবেষকেরা অংশ নেন। 

তাদের হিসাবে, আহতদের মধ্যে ২৯ হাজার থেকে ৪৬ হাজার মানুষের জটিল পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। আহতদের ৮০ শতাংশের বেশি বিস্ফোরণ ও বিমান হামলার শিকার।

যুদ্ধের আগে ২২ লাখের বেশি মানুষের জন্য গাজায় বোর্ড-সনদপ্রাপ্ত প্লাস্টিক ও পুনর্গঠন সার্জন ছিলেন মাত্র আটজন। গবেষণার সহ-লেখক সার্জন অ্যাশ প্যাটেল বলেন, যুদ্ধ-পূর্ব সক্ষমতায় ফিরতে পারলেও সম্ভাব্য অস্ত্রোপচার জট কাটাতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের মে নাগাদ গাজার ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১২টি হাসপাতাল আংশিকভাবে চিকিৎসাসেবা দিতে সক্ষম ছিল। হাসপাতালের মোট শয্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজারে, যেখানে যুদ্ধের আগে তা ছিল ৩ হাজারের বেশি। বিশেষায়িত মাইক্রো-সার্জারির সক্ষমতা প্রায় অনুপস্থিত হয়ে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে সংক্রমণ, রক্তদূষণ ও স্থায়ী অক্ষমতার ঝুঁকি বহুগুণে বাড়ছে বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন।

দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত এক মন্তব্যে গবেষকেরা সরাসরি হামলায় মৃত্যু ও পরোক্ষ কারণে মৃত্যুর সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। বিস্ফোরণে আহত হয়ে মাস পরে সংক্রমণে মৃত্যু, কিংবা বিশুদ্ধ পানি ও অস্ত্রোপচারের অভাবে কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যুকে সরাসরি না পরোক্ষ এই প্রশ্নে একটি ‘ধূসর অঞ্চল’ তৈরি হয়েছে, যা প্রকৃত প্রাণহানির পূর্ণাঙ্গ চিত্রকে আংশিক করে তুলতে পারে।

২০২৫ সালের শেষভাগে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটে। গাজার ৮০ শতাংশের বেশি এলাকা জোরপূর্বক খালি করা হয়; উত্তর গাজায় আগস্টে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়। ফলে আহতদের শারীরিক সক্ষমতা ও অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

গবেষকদের মতে, ধারাবাহিক এসব স্বাধীন গবেষণা আন্তর্জাতিক জবাবদিহি ও অবিলম্বে হামলা বন্ধের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সুরক্ষিত থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে প্রাণহানি ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার বোঝা আরও বাড়বে এমন সতর্কবার্তাই উঠে এসেছে গবেষণা প্রতিবেদনে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়