News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:১৯, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

গাজায় থার্মোবারিক বোমায় মুহূর্তে ‘বাষ্পীভূত’ ২,৮৪২ ফিলিস্তিনি

গাজায় থার্মোবারিক বোমায় মুহূর্তে ‘বাষ্পীভূত’ ২,৮৪২ ফিলিস্তিনি

ফাইল ছবি

গাজা উপত্যকায় আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও মানবতাবিরোধী হিসেবে বিবেচিত থার্মোবারিক বা ভ্যাকুয়াম বোমা ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে আল জাজিরার অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান “দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি”। 

গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও মানবতাবিরোধী হিসেবে বিবেচিত থার্মোবারিক বা ভ্যাকুয়াম বোমার প্রভাবে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির দেহ আক্ষরিক অর্থেই ‘বাষ্পীভূত’ হয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। 

আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘দ্য রেস্ট অব দ্য স্টোরি’-র বরাতে জানা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২,৮৪২ জন ফিলিস্তিনি এমনভাবে বিলীন হয়ে গেছেন যে তাদের মরদেহের কোনো অবশিষ্টাংশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও সামরিক বিশ্লেষকরা একে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস যুদ্ধাপরাধ এবং ‘বৈশ্বিক গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে অন্তত ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনি মুহূর্তের মধ্যে ‘বাষ্পীভূত’ হয়ে নিহত হয়েছেন যাদের দেহের কোনো পূর্ণাঙ্গ অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি।

গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, এসব ঘটনায় নিহতদের দেহ থেকে কেবল রক্তের ছিটে বা ক্ষুদ্র মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সংস্থাটি ‘বিয়োজন পদ্ধতি’ অনুসরণ করে হতাহতদের হিসাব নির্ধারণ করছে। কোনো হামলার পর একটি বাড়িতে কতজন ছিলেন তা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জেনে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় মরদেহ কম পাওয়া গেলে এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও কোনো জৈবিক চিহ্ন না মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।

ফিলিস্তিনের সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, যদি কোনো পরিবার জানায় যে একটি ভবনের ভেতরে পাঁচজন ছিলেন কিন্তু তিনটি মরদেহ উদ্ধার হয়, তবে বাকি দুজনকে তখনই ‘বাষ্পীভূত’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বিশেষত যখন দেয়ালে রক্তের দাগ বা মাথার ত্বকের মতো ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না।

২০২৪ সালের ১০ আগস্ট ভোরে গাজা সিটির আল-তাবিন স্কুলে ইসরায়েলি হামলার সময় ইয়াসমিন মাহানি ধ্বংসস্তূপের ভেতর তার ছেলে সাদকে খুঁজতে গিয়ে রক্ত ও মাংসের ওপর দিয়ে হাঁটেন, কিন্তু সন্তানের কোনো চিহ্ন পাননি। 

আল জাজিরা আরবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মসজিদে ঢুকে দেখেছি চারদিকে রক্ত আর মাংস। একের পর এক হাসপাতাল ও মর্গে খুঁজেছি, কিন্তু দাফন করার মতো কোনো অংশও পাইনি এটাই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।

এমন ট্র্যাজেডি শুধু মাহানির নয়। বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা রফিক বদরান জানান, তার চার সন্তানই বাষ্প হয়ে গেছে। আমি লক্ষবার খুঁজেছি, কিন্তু তাদের এক টুকরো দেহাংশও পাইনি। তারা কোথায় গেল?- তার এই আর্তনাদ যুদ্ধের ভয়াবহতার গভীরতা তুলে ধরে।

আল জাজিরার অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ইসরায়েল নিয়মকানুন উপেক্ষা করে থার্মোবারিক ও তাপভিত্তিক অস্ত্র ব্যবহার করছে, যেগুলো বিস্ফোরণের সময় কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই তাপমাত্রা ৩,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায় বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

আরও পড়ুন: কানাডায় স্কুলে বন্দুক হামলা: হামলাকারীসহ নিহত ১০

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. মুনির আল-বুরশ ব্যাখ্যা করেন, মানবদেহের প্রায় ৮০ শতাংশই পানি। যখন কোনো দেহ ৩,০০০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা এবং প্রচণ্ড বায়ুচাপের সংস্পর্শে আসে, তখন ভেতরের তরল দ্রুত ফুটে উঠে এবং টিস্যু পুড়ে ছাই ও বাষ্পে পরিণত হয় যা এক ধরনের রাসায়নিক প্রক্রিয়া।

রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ ভাসিলি ফাতিগারভ বলেন, এসব বোমায় অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও টাইটানিয়ামের গুঁড়া মেশানো থাকে, যা আগুনের স্থায়িত্ব ও তাপমাত্রা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। এই অস্ত্র প্রথমে জ্বালানিভর্তি মেঘ ছড়িয়ে পরে তা জ্বালিয়ে বিশাল আগুনের গোলা ও শূন্যচাপ সৃষ্টি করে, ফলে লক্ষ্যবস্তু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।

অনুসন্ধানে গাজায় ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত কয়েক ধরনের বোমার কথাও উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমকে-৮৪ ‘হ্যামার’ নামের প্রায় ৯০০ কেজি ওজনের বোমা ৩,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ উৎপন্ন করতে সক্ষম। বিএলইউ-১০৯ বাঙ্কার বাস্টার মাটির নিচে বা বদ্ধ স্থানে বিশাল আগুনের গোলা তৈরি করে সবকিছু পুড়িয়ে দেয়। গত সেপ্টেম্বরে ঘোষিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’ আল-মাওয়াসিতে এই বোমার আঘাতে ২২ জন মুহূর্তেই বাষ্পীভূত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম জিবিইউ-৩৯ গ্লাইড বোমা আল-তাবিন স্কুল হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এটি এমনভাবে তৈরি যে ভবনের কাঠামো আংশিক অক্ষত থাকলেও ভেতরের সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। 
সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, নিখোঁজ মরদেহের ঘটনাস্থলে এই বোমার ডানার অংশও উদ্ধার করা হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার শুধু ব্যবহারকারী দেশকেই দায়ী করে না; সরবরাহকারী দেশগুলোরও দায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্য আলাদা করতে অক্ষম অস্ত্রের ব্যবহার যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আইনজীবী ডায়ানা বাট্টু এই পরিস্থিতিকে ‘বৈশ্বিক গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ জানে যে এসব অস্ত্র যোদ্ধা ও শিশুদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না, তবুও সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। 

আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক তারিক শানদাবও অভিযোগ করেন, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অবরোধ, অনাহার এবং মারণাস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ হয়নি।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ইসরায়েলকে গণহত্যা প্রতিরোধের নির্দেশ দেয় এবং একই বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তবে সহিংসতা কমেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। 

কিছু বিশ্লেষকের মতে, গাজার ঘটনায় বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

শানদাব বলেন, জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ইসরায়েলকে কার্যত দায়মুক্তি দিয়েছে। তবে জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশে ‘সার্বজনীন এখতিয়ার’ আদালত বিকল্প পথ হতে পারে যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।

আল জাজিরার অনুসন্ধান অনুযায়ী, অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অব্যাহত হামলা, অবরোধ এবং মানবিক সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: আল জাজিরা

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়