সংঘাতের ১৪ দিন, রণনীতি না কি পিছুটান, কোন পথে ট্রাম্প?
ফাইল ছবি
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান সংঘাত দুই সপ্তাহের সীমা অতিক্রম করেছে। দীর্ঘায়িত এই সংঘাতের মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এক কঠিন কৌশলগত সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন।
যুদ্ধের শুরুতে যে ঝুঁকিগুলোকে ট্রাম্প প্রশাসন তুলনামূলক কম গুরুত্ব দিয়েছিল, বর্তমানে সেগুলোর নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প কি এই সংঘাত আরও বিস্তৃত করবেন, নাকি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ধীরে ধীরে সরে আসার পথ খুঁজবেন?
যুদ্ধ চালিয়ে গেলে দুর্বল হওয়া ইরানের ওপর আরও চাপ তৈরি সম্ভব হলেও, এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর অর্থনীতি, কূটনীতি এবং সামরিক অবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন হামলার ঘটনা এই প্রভাবকে আরও জটিল করেছে। এতে মার্কিন সামরিক ব্যয় বাড়ছে, সেনাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, এবং রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ নির্বাচনের সময় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, যুদ্ধ থেকে এখনই সরে আসলে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য, বিশেষ করে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা থেকে বিরত রাখা, অপূর্ণ থেকে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ অভিযানে ইতোমধ্যেই ইরানের অনেক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে।
সংঘাতের মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছে বলে দেশটি নিশ্চিত করেছে। তবে ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এখনও টিকে রয়েছে এবং নেতৃত্বে নতুন শক্তি উঠে আসছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান সাইবার হামলা, সমুদ্রপথে মাইন পাতা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করে পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে।
আরও পড়ুন: প্রয়োজনে মিত্রদের পাশে না পেয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভ
যুদ্ধ শুরু থেকে প্রায় ২,১০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ইরানের নাগরিক। জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি জানান, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১,৩০০ জন বেসামরিক। এদিকে মার্কিন বাহিনীতে ১৩ জন সেনা নিহত হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা মোতায়েন করছে। বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা সেখানে অবস্থান করছে, এবং নতুন করে ২,৫০০ মেরিন সদস্য পাঠানো হচ্ছে। মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের কাছেও হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়েছে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে। এই জলপথে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবহন হয়, কিন্তু হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজ এখন এটি ব্যবহার করতে সাহস পাচ্ছে না। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়েছে। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রিটেনকে ওই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র একা এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক জোট গড়ার চেষ্টা করছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও এখনও মূল প্রশ্ন হিসেবে রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের কাছে প্রায় ৯৭০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ে। এই উপাদানগুলি গভীর ভূগর্ভস্থ স্থানে সংরক্ষিত।
মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, এগুলো সরিয়ে নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে ইরান আবার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করতে পারে। তবে তাতে বিশেষ সামরিক অভিযান প্রয়োজন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক শক্তি ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তার মতে, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বড় অংশ ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান এখনও বিভিন্ন উপায়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে।
পরিস্থিতি এবং ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কারণে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








