বাহরাইনের প্রধান তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা: ‘ফোর্স মজিউর’ ঘোষণা
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনার পারদ আরও চড়িয়ে বাহরাইনের প্রধান তেল শোধনাগারে ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার পর শোধনাগার এলাকা থেকে আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
সোমবার (০৯ মার্চ) ভোরে দেশটির একমাত্র ও বৃহত্তম এই শোধনাগারে হামলার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানায় বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
হামলার শিকার প্রতিষ্ঠানটি হলো রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি বাহরাইন পেট্রোলিয়াম কোম্পানি (বাপকো), যা দেশটির জ্বালানি খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার পরিচালনা করে। শোধনাগারটি সিত্রা দ্বীপে অবস্থিত এবং এটিকে বাহরাইনের বৃহত্তম ও একমাত্র তেল শোধনাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই ঘটনার পরপরই ‘বাপকো এনার্জিস’ তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ‘ফোর্স মজিউর’ (অপ্রতিরোধ্য পরিস্থিতি) ঘোষণা করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী তেল সরবরাহের বাধ্যবাধকতা থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম দিকে সরকারি সূত্র থেকে ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে ইরানের ড্রোন হামলার কারণে শোধনাগারটিতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। হামলার কিছু সময় পর শোধনাগার এলাকা থেকে ঘন ধোঁয়া আকাশে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
হামলার পর কোম্পানিটি জানায়, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ফলে চুক্তি অনুযায়ী তেল সরবরাহের বাধ্যবাধকতা আপাতত পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি বাপকো এনার্জিস তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ‘ফোর্স মজিউর’ ঘোষণা করে।
ফরাসি শব্দগুচ্ছ ‘ফোর্স মজিউর’ বলতে সাধারণত এমন পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এ ধরনের ঘোষণা দেওয়া হলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কোনো ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হলে প্রতিষ্ঠানটি চুক্তির দায় থেকে অব্যাহতি পায়।
আরও পড়ুন: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হলেন খামেনি পুত্র মোজতোবা
বাপকো এনার্জিস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আঞ্চলিক সংঘাত এবং শোধনাগারে সরাসরি হামলার কারণে তাদের অনেকগুলো চুক্তিবদ্ধ দায়িত্ব সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি আশ্বস্ত করেছে যে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে তাদের কাছে পর্যাপ্ত বিকল্প পরিকল্পনা রয়েছে এবং স্থানীয় বাজারে জ্বালানির কোনো ঘাটতি হবে না।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানিয়েছেন, হামলার সময় শোধনাগারের একটি ইউনিটে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর সেখানে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এতে সিত্রা এলাকায় কিছু ক্ষয়ক্ষতি ও আহতের খবর পাওয়া গেছে, যদিও শোধনাগারের ভেতরে কোনো প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর পুরো এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এদিকে বাহরাইনের রাজধানীর কাছাকাছি এলাকায় ইরানের ড্রোন হামলায় অন্তত ৩২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা বাহরাইন নিউজ এজেন্সি। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, আহতদের সবাই বাহরাইনের নাগরিক। তাদের মধ্যে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী রয়েছে, যার মাথা ও চোখে গুরুতর আঘাত লেগেছে। আহতদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী একজনের বয়স মাত্র দুই মাস।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আহতদের মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন শিশুর অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের দশম দিনে এই হামলার ঘটনা ঘটল। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা যুদ্ধের শুরুর তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।
এর আগে কাতার ও কুয়েতও তাদের জ্বালানি রপ্তানিতে একই ধরনের ‘ফোর্স মজিউর’ ঘোষণা করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা ও সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
সূত্র: রয়টার্স, টাইমস অব ইসরাইল।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








