স্টাফ রিপোর্টার || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৩:৩৯, ৭ আগস্ট ২০২৬

আবারও ‘আইএসপি’ পরিচয় ফিরে পাচ্ছেন ইন্টারনেট সেবাদাতারা

আবারও ‘আইএসপি’ পরিচয় ফিরে পাচ্ছেন ইন্টারনেট সেবাদাতারা

ছবি: সংগৃহীত

নতুন টেলিকম নীতিমালার সংশোধনীতে দেশের ইন্টারনেট সেবাদাতারা আবারও ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী বা আইএসপি হিসেবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদিত টেলিকমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক অ্যান্ড লাইসেন্সিং পলিসি, ২০২৫-এ তাদের ফিক্সড টেলিকম সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের নির্দেশনায় গত কয়েক মাসে আগের সরকারের করা বিভিন্ন নীতিমালা ও নির্দেশিকা পর্যালোচনা করে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশোধিত নীতিমালা ও নির্দেশিকাগুলো অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

সংশোধিত নীতিমালায় আইএসপি লাইসেন্সের ধরন কমিয়ে দুটি শ্রেণি করা হয়েছে। এগুলো হলো- দেশব্যাপী আইএসপি এবং জেলাভিত্তিক আইএসপি।

দেশব্যাপী লাইসেন্সধারীরা সারা দেশে তারযুক্ত বা নির্দিষ্ট বেতার প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড, নির্দিষ্ট টেলিফোন, তথ্যসেবা, আইপি টিভি, সমন্বিত সেবা, ইন্টারনেট অব থিংসসহ বিভিন্ন অতিরিক্ত সেবা দিতে পারবেন। অন্যদিকে জেলাভিত্তিক আইএসপিরা নির্দিষ্ট জেলার মধ্যে ইন্টারনেট ও তথ্যসেবা দিতে পারবেন। প্রয়োজনে তারা দেশব্যাপী লাইসেন্সধারীদের পুনর্বিক্রেতা হিসেবেও কাজ করতে পারবেন।

নীতিমালায় আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ, মূল নেটওয়ার্ক ও গ্রাহকের শেষ প্রান্তের সংযোগ নিয়েও নতুন নির্দেশনা রাখা হয়েছে। দেশব্যাপী আইএসপিদের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ বিটিআরসি অনুমোদিত আন্তর্জাতিক সংযোগ সেবাদাতার মাধ্যমে সাবমেরিন কেবল ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করে সংগ্রহ করতে হবে। নেটওয়ার্কের নিরবচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করতে সাবমেরিন কেবলভিত্তিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কলের ক্ষেত্রেও রাজস্ব ভাগাভাগির কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। আগত আন্তর্জাতিক কল থেকে মূল্য সংযোজন কর বাদ দিয়ে অর্জিত আয়ের ৭০ শতাংশ বিটিআরসি এবং ৩০ শতাংশ আইএসপি পাবে। বহির্গামী আন্তর্জাতিক কলের ক্ষেত্রে নিট ভারসাম্যের ৫৫ শতাংশ বিটিআরসি এবং ৪৫ শতাংশ আইএসপির মধ্যে ভাগ হবে।

ব্যাকবোন ও ব্যাকহল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। কোনো আইএসপি নিজস্ব দীর্ঘ দূরত্বের ব্যাকবোন নেটওয়ার্ক নির্মাণ করতে পারবে না। এ ধরনের সংযোগের জন্য নিবন্ধিত টাওয়ার ও সংযোগ সেবাদাতাদের কাছ থেকে ডার্ক ফাইবার বা সঞ্চালন সুবিধা ইজারা নিতে হবে।

লাস্ট মাইল সংযোগের ক্ষেত্রে শহর ও পৌর এলাকায় একই ওয়ার্ডে থাকা সেবা কেন্দ্র থেকে গ্রাহক পর্যন্ত নিজস্ব কেবল স্থাপনের সুযোগ থাকবে। গ্রামীণ এলাকায় সেবা কেন্দ্র না থাকলে পাশের ইউনিয়ন থেকে সংযোগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বড় পরিসরের সংযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংযোগ সেবাদাতার নেটওয়ার্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি ঝুলন্ত তারের জট কমাতে ধাপে ধাপে ভূগর্ভস্থ কেবল ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

লাইসেন্স ও আর্থিক কাঠামো

দেশব্যাপী আইএসপি লাইসেন্সের জন্য ২০ লাখ টাকা লাইসেন্স ফি এবং ১০ লাখ টাকা বার্ষিক ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলাভিত্তিক লাইসেন্সের ক্ষেত্রে এই ফি যথাক্রমে ১ লাখ ও ৫০ হাজার টাকা।

দেশব্যাপী লাইসেন্সধারীদের ২০ লাখ টাকা এবং জেলা আইএসপিদের ৫০ হাজার টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। আইপি টেলিফোনি সেবা থেকে অর্জিত বার্ষিক নিরীক্ষিত মোট আয়ের ২ শতাংশ বিটিআরসিকে রাজস্ব হিসেবে দিতে হবে। তবে নতুন লাইসেন্সধারীরা প্রথম দুই বছর এই বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাবেন।

তৃতীয় বছর থেকে দেশব্যাপী আইএসপিদের বছরে ৫ লাখ টাকা সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলে জমা দিতে হবে। জেলা আইএসপিদের ক্ষেত্রে রাজস্ব ভাগাভাগি ও এই তহবিল প্রযোজ্য হবে না।

মালিকানা ও বিদেশি বিনিয়োগ

একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একই সময়ে একাধিক আইএসপি লাইসেন্স কিংবা দেশব্যাপী ও জেলা—দুই ধরনের লাইসেন্স রাখতে পারবে না। মোবাইল অপারেটর, টাওয়ার কোম্পানি, আন্তর্জাতিক সংযোগ সেবাদাতা এবং অ-ভূমিভিত্তিক নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারীরাও সরাসরি আইএসপি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন না।

দেশব্যাপী আইএসপিতে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে অন্তত ২০ শতাংশ দেশীয় অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

পাঁচ বছরের মধ্যে সেবা সম্প্রসারণের বাধ্যবাধকতা

লাইসেন্স পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে সেবা চালু করতে হবে। এরপর পাঁচ বছরের মধ্যে নির্ধারিতসংখ্যক জেলা, সেবা কেন্দ্র ও গ্রাহকের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থ বাজেয়াপ্ত করার বিধান রাখা হয়েছে।

জেলাভিত্তিক আইএসপিদের প্রথম বছরে অন্তত ১০০ জন গ্রাহক দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে পঞ্চম বছরে ৮০০ গ্রাহকে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গ্রাহক সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তায় গুরুত্ব

নতুন নীতিমালায় আইএসপিদের বিনামূল্যে অভিভাবক নিয়ন্ত্রণ সেবা চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় ব্রডব্যান্ড নীতিমালায় নির্ধারিত গতির নিচের কোনো সেবাকে ব্রডব্যান্ড হিসেবে প্রচার করা যাবে না।

গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক ও লগ অন্তত এক বছর দেশে সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে। বিটিআরসির অনুমতি ছাড়া গ্রাহকের তথ্য প্রকাশ বা বিক্রিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সব আইএসপিকে জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের আইনসম্মত নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। ২৪ ঘণ্টা নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও নিরাপত্তা কেন্দ্র চালু রাখা এবং বড় ধরনের সাইবার হামলা বা ঘটনার তথ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিটিআরসিকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ভারতে মাইক্রোসফটের বৃহত্তম ডেটা সেন্টার চালু

তবে সংশোধিত নীতিমালার কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ইন্টারনেট সেবাদাতারা। ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠনের সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে আইএসপিদের কার্যক্রমের সীমারেখা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। মোবাইল অপারেটররা যেন নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে আইএসপি খাতে প্রবেশ করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আইএসপিদের জন্য পুনর্বিক্রেতা ব্যবস্থা চালুর বিরোধিতা করছেন তারা। এতে খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকরা মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়