‘১৭ বছরের অভিজ্ঞতায় প্রথম একসঙ্গে ৯ কবর, হাত কাঁপছিল’
ছবি: সংগৃহীত
একটি নতুন জীবনের শুরু হওয়ার কথা ছিল উৎসবের আমেজে, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই আনন্দ রূপ নিয়েছে এক বিভীষিকাময় শোকগাথায়। বাগেরহাটের রামপালে যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত বর-কনেসহ ১৪ জনের মরদেহ দাফন ও শেষ বিদায়ের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হলো একটি ট্র্যাজিক অধ্যায়।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) জুমার নামাজ শেষে মোংলা পৌর কবরস্থানে একই পরিবারের ৯ সদস্যকে পাশাপাশি সারিবদ্ধ কবরে শায়িত করা হয়েছে।
সতেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে কবরস্থানের দায়িত্ব পালন করা খাদেম মুজিবুর ফকিরের অভিজ্ঞতায় এটি ছিল জীবনের সবচেয়ে ভারী ও হৃদয়বিদারক কাজ।
ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার (১১ মার্চ) রাতে। খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার মিতুর সঙ্গে বিয়ে হয় মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান ছাব্বিরের।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে বর-কনেসহ স্বজনরা একটি মাইক্রোবাসে করে মোংলার উদ্দেশে রওনা হন। বেলা সোয়া ১২টার দিকে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া মাইক্রোবাসের চালকসহ ঘটনাস্থলেই এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে মোট ১৪ জন প্রাণ হারান।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মোংলার আব্দুর রাজ্জাকের পরিবার। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বর আহাদুর রহমান ছাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী এবং ভাগনে সামিউল ইসলাম ফাহিম।
এছাড়া রাজ্জাকের বড় ছেলে আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল এবং তাদের তিন সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরামও না ফেরার দেশে চলে গেছেন। একমাত্র জীবিত থাকা আশরাফুল আলম জনি তার স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোনসহ সবাইকে হারিয়ে এখন দিশেহারা।
শোকাতুর কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেল, আমি এখন একেবারেই একা।
আরও পড়ুন: বাগেরহাটে বাস-মাইক্রোবাস মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৩ জনের প্রাণহানি
অন্যদিকে, কনে মার্জিয়া আক্তার মিতু, তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ার বেগমকে তাদের নিজ গ্রাম খুলনার কয়রায় দাফন করা হয়েছে। মাইক্রোবাস চালক নাঈম শেখের দাফন সম্পন্ন হয়েছে রামপালের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে।
মোংলা পৌর কবরস্থানের দীর্ঘদিনের গোরখোদক মুজিবুর ফকির, বারেক ও রমজান শুক্রবার সকাল থেকেই কবর খননের কাজ শুরু করেন।
মুজিবুর ফকির জানান, প্রায় ১৮ বছরের পেশাগত জীবনে তিনি এর আগে কখনো একই পরিবারের এতজন সদস্যের জন্য বা একসঙ্গে ৯টি কবর খুঁড়েননি। কবরের সারিতে ছিল ৭টি বড় এবং ২ জন শিশুর জন্য ছোট কবর।
কবর খুঁড়তে গিয়ে আবেগাপ্লুত মুজিবুর বলেন, পরিবারের সম্মতিতে পাশাপাশি ৯টি কবর প্রস্তুত করেছি। কাজ করার সময় হাত কাঁপছিল, এমন দৃশ্য সহ্য করা কঠিন।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হাজারো মানুষের ঢল নামে। এর আগে মরদেহগুলো যখন মোংলার শেলাবুনিয়া এলাকায় পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় শোকের মাতম শুরু হয়। ৯টি মরদেহ বহনের জন্য আশপাশের বিভিন্ন মসজিদ থেকে ৯টি খাটিয়া সংগ্রহ করতে হয়। জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে আগে থেকে প্রস্তুত রাখা সারিবদ্ধ কবরগুলোতে একে একে দাফন করা হয় স্বজনদের।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) গোলাম মো. বাতেন জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল, জেলা পরিষদ এবং সড়ক পরিবহন আইনের ৫৪ ধারার আওতায় নিহতদের পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে নিহত মাইক্রোবাস চালকের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার হাসান চৌধুরী জানান, দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিছক একটি সড়ক দুর্ঘটনা কীভাবে একটি সাজানো গোছানো পরিবারকে মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে, মোংলার এই বিয়োগান্তক ঘটনা তার এক জ্বলন্ত ও বেদনাদায়ক উদাহরণ হয়ে রইল।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








