হাসানুজ্জামান হাসান, লালমনিরহাট থেকে || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:৫৯, ৭ জুলাই ২০২৬
আপডেট: ১৯:০৪, ৭ জুলাই ২০২৬

ঠিকাদারকে নির্মিত উইং ভেঙে নতুন করে নির্মাণের নির্দেশ এলজিইডির

লালমণিরহাটে সেতু নির্মাণে অনিয়ম

ঠিকাদারকে নির্মিত উইং ভেঙে নতুন করে নির্মাণের নির্দেশ এলজিইডির

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি সেতু নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পর তদন্তে প্রাথমিকভাবে ত্রুটি ধরা পড়ায় সেতুর চার কোণার চারটি উইং (প্রোটেকশন পিলার) ভেঙে সিডিউল অনুযায়ী নতুন করে নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছে এলজিইডি।

গত রবিবার (২১ জুন) এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজবাংলাদেশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে ঠিকাদারকে এ নির্দেশনা দেয় এলজিআরডি।

রবিবার (৭ জুলাই) সকাল থেকে পুরোনো অবকাঠামো অপসারণের কাজ শুরু করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বোর্ডেরহাট এলাকায় ৭ দশমিক ৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ মিটার প্রস্থের সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর গত ২০ জুন বিকেলে যান ও জনসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু উদ্বোধনের দিনই সেতুর চারটি উইংয়ে ফাটল দেখা দেয়। এতে সেতুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয়রা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ শুরু করেন।

খবর পেয়ে এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে তদন্তের ভিত্তিতে চারটি উইং ভেঙে নতুন করে নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এলজিইডি সূত্র জানায়, হাতীবান্ধা উপজেলার দৈখাওয়া কলেজ থেকে ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের বুড়ির বাজার পর্যন্ত ৯ দশমিক ৩ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার এবং একই সড়কে একই দৈর্ঘ্যের চারটি সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ১৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পান ঠিকাদার গোলাম মাওলা।

চুক্তি অনুযায়ী গত জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেতুগুলোর নির্মাণ শেষ হলেও এখনো সড়কের কার্পেটিং সম্পন্ন হয়নি।

বোর্ডেরহাট এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, "সেতু নির্মাণে এমন নিম্নমানের কাজ হয়েছে যে উদ্বোধনের দিনই ফাটল দেখা দেয়। শুধু এই সেতু নয়, পুরো প্রকল্পেই ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে।"

তার অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিম্নমানের ও নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী একাধিকবার আপত্তি জানালেও এলজিইডি কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি।

"আমরা নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু এলজিইডি আমাদের অভিযোগ উপেক্ষা করে ঠিকাদারের পক্ষ নিয়েছে। উল্টো ঠিকাদার আমাদের মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকিও দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: খুলে দেয়ার ১ ঘণ্টা পরেই ব্রিজে ফাটল

একই গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, সড়ক সংস্কারেও নিম্নমানের ইট, ইটের খোয়া ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি সেতু নির্মাণে নিম্নমানের রড এবং নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম রড ব্যবহারের অভিযোগও করেন তিনি।

তার দাবি, "বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেতুর ফাটলের খবর প্রকাশের পরই এলজিইডি নড়েচড়ে বসেছে। সংবাদ প্রকাশ না হলে হয়তো কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হতো না। তিনি পুরো প্রকল্পের নির্মাণকাজ স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের ঠিকাদার গোলাম মাওলা বলেন, "এ বিষয়ে যা বলার এলজিইডির প্রকৌশলী বলবেন। আমার কোনো মন্তব্য নেই।

তবে নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাতীবান্ধা উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আখতার হোসেন।

তিনি বলেন, "ঠিকাদার আমাদের না জানিয়ে ঈদের ছুটির সময় সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করেছেন। তখন আমাদের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি ঠিকাদার নিজ উদ্যোগে সেতুটি চালুও করেছেন।"

তিনি আরও বলেন, "এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ী ঠিকাদার নতুন করে উইং নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন। পুরো বিষয়টি আমি গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করছি।"

লালমনিরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কাওছার আলম বলেন, সেতুর মূল অবকাঠামো থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।"পরীক্ষায় যদি প্রমাণিত হয় যে নিম্নমানের অথবা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে পুরো সেতু ভেঙে নতুন করে নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হবে।

তিনি জানান, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঠিকাদারকে সড়কের কার্পেটিং কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণের মান যাচাইয়ের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কাওছার আলম আরও বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে এলজিইডির কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়