News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৫৪, ১৩ মার্চ ২০২৬

মন্দা অর্থনীতিতেও এক বছরে নতুন কোটিপতি ১২ হাজার

মন্দা অর্থনীতিতেও এক বছরে নতুন কোটিপতি ১২ হাজার

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধীরগতি, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির আলোচনার মধ্যেই ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের আমানতের হিসাব উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে দেশে এক কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যাংক হিসাব প্রায় ১২ হাজার বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টি। এর এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি। ফলে এক বছরের ব্যবধানে দেশে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৯৬৩টি কোটিপতি হিসাব।

শুধু বার্ষিক হিসাবে নয়, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকেও এ ধরনের হিসাব দ্রুত বেড়েছে। ওই বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে কোটি টাকার হিসাব ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৭০টি। তিন মাসের ব্যবধানে আরও ৫ হাজার ৯৭৪টি হিসাব যুক্ত হয়ে ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টিতে।

কোটিপতি হিসাব বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব হিসাবে জমা থাকা অর্থের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে কোটি টাকার হিসাবগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ২১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। তিন মাস পর ডিসেম্বর শেষে তা ৩৪ হাজার ২১৪ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ৫৫ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকায়।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব মানেই যে একজন ব্যক্তি কোটিপতি বিষয়টি সব ক্ষেত্রে এমন নয়। কারণ ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যাংকে বড় অঙ্কের অর্থ জমা রাখে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একাধিক ব্যাংকে একাধিক হিসাবও থাকতে পারে। ফলে পরিসংখ্যানের প্রতিটি হিসাব আলাদা আলাদা ব্যক্তিকে নির্দেশ করে না।

আরও পড়ুন: দেশের বাজারে আবারও কমল স্বর্ণের দাম

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা দেশের আয়বৈষম্য বৃদ্ধির একটি ইঙ্গিতও হতে পারে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, দেশের অর্থনীতির গতি কমেছে এবং একই সঙ্গে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব- বিশেষ করে ছদ্মবেকারত্ব বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কোটিপতি হিসাব বাড়ার অর্থ হলো সম্পদের সুষম বণ্টন হচ্ছে না এবং আয়বৈষম্য বাড়ছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে এই বৈষম্য আরও বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। 

তার মতে, রাজস্ব নীতি ও করকাঠামোর বিদ্যমান বৈষম্যের কারণে ধনীরা আরও বেশি সম্পদ সঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছেন, যা সামাজিক বৈষম্যকে গভীর করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এই প্রবণতাকে অর্থনীতির স্বাভাবিক সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। 

তার মতে, দেশের অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে বড় হচ্ছে, মানুষের গড় আয় বাড়ছে এবং ব্যাংকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকে বড় অঙ্কের আমানতের হিসাবও স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা গত কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। 
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে এমন হিসাব ছিল ৯৩ হাজার ৮৯০টি। এক বছরের ব্যবধানে ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৯ হাজার ৭৬টিতে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে হয় ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪৬টি এবং ২০২৩ সালের ডিসেম্বর নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টিতে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা পৌঁছায় ১ লাখ ২২ হাজার ৮১-এ। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টিতে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক প্রবণতা দেশের আর্থিক খাতে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের হাতে সম্পদ ক্রমশ বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়