রাজধানীতে ভোজ্যতেলের বোতল উধাও, চড়া দামে খোলা সয়াবিন
ফাইল ছবি
রাজধানীর ভোজ্যতেলের বাজারে হঠাৎ করেই তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বাজারের খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের চরম সরবরাহ সংকট চলছে। বিশেষ করে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত তেল বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে। এই সুযোগে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে।
বুধবার (১১ মার্চ) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, মুগদা, খিলগাঁও এবং মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে তেলের বাজারের এই নাজুক চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ মুদি দোকানে ৫ লিটারের বোতল সীমিত পরিমাণে পাওয়া গেলেও ১ ও ২ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই বললেই চলে। ভোক্তারা এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরেও তাদের চাহিদামতো ছোট বোতল সংগ্রহ করতে পারছেন না।
যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা কাজী শামীম জানান, ছোট বোতল না পেয়ে বাধ্য হয়ে ৫ লিটারের জার কিনতে হয়েছে তাকে। বাজারে পুষ্টি, রূপচাঁদা, বসুন্ধরা ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের তেল কিছু পরিমাণে দেখা গেলেও অন্যান্য ব্র্যান্ডের উপস্থিতি প্রায় শূন্য।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ডিলার পর্যায় থেকে সরবরাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। যেখানে আগে দিনে ৮-১০ কার্টন তেল আসত, এখন সেখানে মাত্র ২-৩ কার্টন সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: জ্বালানি তেল সরবরাহে নতুন নির্দেশনা
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে বেশি কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্রেতা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের আশঙ্কায় প্রয়োজনের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ তেল মজুত করছেন। একইসাথে আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে বাড়তি চাহিদাও বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে লাভের সমন্বয়হীনতাও এই সংকটের অন্যতম কারণ। বর্তমানে ৫ লিটারের বোতলের নির্ধারিত মূল্য ৯৫৫ টাকা হলেও ডিলাররা ৯৩০ টাকার পরিবর্তে ৯৪৫-৯৫০ টাকায় বিক্রি করছেন, যার ফলে খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা কমে ৫ টাকায় নেমে এসেছে। অনেক এলাকায় সরকারি দাম অমান্য করে ১ লিটারের বোতল ২২০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
বোতলজাত তেলের এই হাহাকারের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে খোলা তেলের বাজারে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে প্রায় ১০-১৫ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন ২০৮ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা রমজানের শুরুতে ছিল ১৯৫ থেকে ২০০ টাকা। একইভাবে খোলা পাম তেলের দামও কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ১৭০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সুপারশপগুলোতেও তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক নেই; অনেক চেইন শপে একজন ক্রেতার জন্য তেলের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে (রেশনিং)। কোনো কোনো দোকানে বিকল্প হিসেবে ভোক্তাদের চড়া দামের ক্যানোলা তেল কিনতে দেখা গেছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজারের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারির ঘোষণা দিয়েছে।
সংস্থাটির মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ জানিয়েছেন, সরবরাহ সংকটের নেপথ্যে কোনো কৃত্রিম কারসাজি আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো ডিলার বা বিক্রেতা অবৈধ মজুত কিংবা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি রাখলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ক্রেতা ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আসন্ন ঈদের আগে ভোজ্যতেলের বাজার আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








