News Bangladesh

সুদীপ্ত শামীম, গাইবান্ধা থেকে || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:০৫, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
আপডেট: ০৯:১৪, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫

ভুয়া নিয়োগ ও জাল নথিপত্রে এমপিও অগ্রায়ন করেন জেলা শিক্ষা অফিসার

ভুয়া নিয়োগ ও জাল নথিপত্রে এমপিও অগ্রায়ন করেন জেলা শিক্ষা অফিসার

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে ভুয়া নিয়োগ ও জাল নথিপত্রের মাধ্যমে এক কথিত সহকারী শিক্ষকের অনলাইনে এমপিওভুক্তির আবেদন অগ্রায়ন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, জাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, সৃজনকৃত নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাগজপত্র, যাচাই-বাছাই কমিটির নথি ও ব্যাকডেটে প্রস্তুত করা সিএস কপির মাধ্যমে মো. মোজাম্মেল হক নামের এক ব্যক্তির এমপিওভুক্তির আবেদন অনলাইনে দাখিল ও অগ্রায়ন করা হয়। আবেদনে দাবি করা হয়, তিনি ২০০৪ সালে সাদুল্লাপুর উপজেলার হিংগারপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও বিএম কলেজে সহকারী শিক্ষক (আইসিটি) হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

শিক্ষক সমাজের অভিযোগ, কয়েক লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবিএম নকিবুল হাসান ওই জালিয়াতিপূর্ণ আবেদনটি অগ্রায়ন করেন। পরবর্তীতে জেলা শিক্ষা অফিসার মো. আতাউর রহমান যথাযথ যাচাই ছাড়াই আবেদনটি রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠান। গত ১২ ডিসেম্বরের আগেই তড়িঘড়ি করে ফাইল পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে, যা নিয়ে শিক্ষক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানান, এমপিওভুক্তির আবেদন অগ্রায়নের জন্য মোজাম্মেল হকের সঙ্গে কয়েক লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই অর্থ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আতাউর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এমপিও আবেদন বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে আবেদনটি ভুয়া কিনা, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যাচাই করবে বলে জানান। ভুয়া নিয়োগের দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের বলে মন্তব্য করেন তিনি। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এবিএম নকিবুল হাসানের সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই। নকিবুলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

আরও পড়ুন: টার্গেট কিলিংয়ের নেপথ্যে সুব্রত বাইনের কন্যা

অন্যদিকে, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবিএম নকিবুল হাসানের কাছে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি নিজেকে সাবেক সাংবাদিক দাবি করে তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ এবং চায়ের দাওয়াত দেওয়ার প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এর আগে অনলাইনে মোজাম্মেল হকের এমপিও আবেদন নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে স্থানীয় সাংবাদিকরা অনুসন্ধান শুরু করেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি এমপিও আবেদন যাচাইয়ের জন্য গঠিত সাদুল্লাপুর উপজেলা কমিটি তার সিএস কপিতে তৎকালীন শিক্ষা অফিসারের স্বাক্ষর নেই বলে মন্তব্য করে। পরে সিএস কপির লেখা আড়াল করে জাল সিল ও স্বাক্ষর বসিয়ে টেম্পারিং করে তা আবেদনে সংযুক্ত করা হয়।

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০০৪ সালে ‘দৈনিক আখিরা’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি কথিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে নিয়োগ পরীক্ষা ও যোগদানের তারিখ দেখানো হয়েছে। তবে ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হলে উপজেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ে এসব জালিয়াতি ধরা পড়ে।

এ ঘটনায় অনিয়ম ও ঘুষ-বাণিজ্যের প্রতিকার চেয়ে গত বুধবার (১০ ডিসেম্বর) গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারীরা। অভিযোগে বলা হয়, পলাশবাড়ীর পাশাপাশি সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জ এই তিনটি উপজেলার দায়িত্ব এককভাবে পালনের সুযোগ নিয়ে এবিএম নকিবুল হাসান দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, মোজাম্মেল হকের পাশাপাশি মাদারহাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাদেকুল ইসলাম এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী খালেদা খাতুনের এমপিও আবেদনও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে দাখিল করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর জেলা শিক্ষা অফিসার ওই দুটি আবেদন বাতিল করেন।

লিখিত অভিযোগের পর নিজের অবস্থান রক্ষায় নকিবুল হাসান তদবিরে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং অভিযোগকারীদের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। সোমবার দুপুরে রওশন আলম নামে এক সহকারী শিক্ষকের মাধ্যমে সহকারী প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর কবিরকে ফোন করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

এ অবস্থায় ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে নকিবুল হাসানকে পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং দাখিল করা অভিযোগগুলোর দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।ৃ

নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়