নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৫১, ৮ জুন ২০২৬

নগরে মাঠ ও পার্ক পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নে অনড় সরকার

নগরে মাঠ ও পার্ক পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নে অনড় সরকার

ছবি: সংগৃহীত

ইট-পাথরের ব্যস্ত ধূলিধূসর নগরে চার দেয়ালে বন্দি হয়ে পড়েছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। শৈশবের চঞ্চলতা আর কৈশোরের উদ্যম আজ আটকে গেছে মোবাইলের ডিজিটাল স্ক্রিনের ভার্চুয়াল জগতে। এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি থেকে শিশু-কিশোরদের মুক্ত বাতাসে ফিরিয়ে আনতে এবং দেশের খেলার মাঠ ও পার্কগুলোকে দখলদার ও মাদকসেবীদের কবল থেকে মুক্ত করতে জাতীয় সংসদে জোর দাবি উঠেছে। এর জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে জানানো হয়েছে, খেলার মাঠ ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো পুনরুদ্ধার এবং আধুনিকায়নে সরকার সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর এবং ইতিমধ্যেই ঢাকাসহ সারা দেশে এই সংক্রান্ত উচ্ছেদ ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সোমবার (০৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা বাজেট অধিবেশনে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধি অনুসারে আনা এক জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই আশ্বাসের কথা জানান। 

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির উত্থাপিত নোটিশের ওপর ভিত্তি করে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।

সংসদে দেশের খেলার মাঠ ও পার্কগুলোর বেহাল এবং আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরে সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরের পার্ক এবং খেলার মাঠগুলো একসময় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা আর বয়স্কদের একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার প্রিয় ঠিকানা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক ও ভয়াবহ। পার্ক ও মাঠগুলো এখন পরিণত হয়েছে মাদকের কারবার, হকারের উৎপাত আর বখাটেদের আড্ডাস্থলে। কোথাও চলছে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের প্রকাশ্য অবৈধ দখলদারিত্ব, আবার কোথাও শিশুদের বিনোদনের নামে বাণিজ্যিক পার্ক তৈরি করে প্রকৃতির স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও এর মূল উপযোগিতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে নিরাপদ পরিবেশের অভাবে মানুষ ও শিশুরা ঘরের কোণে মোবাইল পর্দার ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সাম্প্রতিক গবেষণার উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দুই অঞ্চলের ১২৯টি ওয়ার্ডে কাগজে-কলমে মাত্র ২৩৫টি খেলার মাঠ রয়েছে, যা গড়ে প্রতি ওয়ার্ডে দুটিও পড়ে না। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এর মধ্যে সাধারণ মানুষ ও শিশুরা কোনোমতে মাত্র ৪২টি মাঠ ব্যবহারের সুযোগ পায়, যা মোট মাঠের মাত্র ১৮ শতাংশ। বাকি প্রায় ৬০ শতাংশ মাঠই বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান, ক্লাব ও অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে গেছে, যেখানে অনৈতিকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে মার্কেট কিংবা হাটবাজার। ঐতিহ্যবাহী ধূপখোলা মাঠ, শ্যামলী মাঠ কিংবা মিরপুরের বেশ কিছু মাঠে প্রতিদিন বা সপ্তাহে কাঁচাবাজার বসিয়ে মাঠের পরিধি স্থায়ীভাবে সংকুচিত করা হয়েছে।

এমনকি ২০২৫ সালের একটি বিশেষ রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দখলের গ্রাসে ঢাকা থেকে ইতিমধ্যেই ১২৬টি মাঠ সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। এই অবস্থায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ ও সুন্দর আবহে ফিরিয়ে নিতে বই-খাতা আর খেলার মাঠকে প্রধান সহায় করার জন্য তিনি মন্ত্রীর কাছে জোর দাবি জানান।

আরও পড়ুন: দুর্যোগ মোকাবিলায় নীতিমালা আধুনিকায়ন ও নতুন মহাপরিকল্পনা সরকারের

সংসদ সদস্যের উত্থাপিত তথ্যের বেশিরভাগই সত্য বলে স্বীকার করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে দেশের বেশিরভাগ খেলার মাঠ ও ফাঁকা জায়গা অবৈধভাবে দখল করে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশের পরিবেশ রক্ষায় এবং যুবসমাজের কল্যাণে সেসব মাঠ ও পার্ক উদ্ধার করে জনসাধারণের উপযোগী করার কাজকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ২৫৬টি পার্ক ও খেলার মাঠের উন্নয়ন এবং পুনরুদ্ধারের কাজ পর্যায়ক্রমে এগিয়ে চলছে। 

উদাহরণ হিসেবে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, একসময়ের হকার, ভবঘুরে ও অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত গুলিস্থানের শহীদ মতিউর রহমান পার্কটি এখন সম্পূর্ণ হকারমুক্ত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে একটি আদর্শ আধুনিক পার্কে রূপান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া মলিহালা পার্ক, মতিঝিল পার্ক, নবাবগঞ্জ পার্ক, রসুলবাগ মাঠ, খিলগাঁও-বাসাবো মাঠ, সাদেক হোসেন খোকা মাঠ, হাজারীবাগ পার্ক ও আমলীগোলা খেলার মাঠসহ অসংখ্য বিনোদন কেন্দ্রের উন্নয়ন কাজ বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ৩৮টি পার্ক ও মাঠকে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও পরিবেশবান্ধব করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। উত্তর সিটিতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে না বলেও মন্ত্রী সংসদকে নিশ্চিত করেন। মাঠের সংকট দূরীকরণের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার গতি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশজুড়ে ইন্টার স্কুল ফুটবল ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু করা হয়েছে, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

কেবল ঢাকা কেন্দ্রিক উন্নয়ন নয়, ঢাকার বাইরেও বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর বিনোদন কেন্দ্র সংস্কারের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। সংসদে মন্ত্রী জানান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডে পর্যায়ক্রমে নতুন খেলার মাঠ ও পার্ক নির্মাণের প্রকল্প চলমান রয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটির কাজ ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ঐতিহ্যবাহী হাদিস পার্ক, জাতিসংঘ শিশু পার্ক ও নিরালা আবাসিক এলাকার পার্কসহ প্রধান প্রধান বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে সুস্থ ও পারিবারিক পরিবেশ বজায় রাখতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। এর ফলে পার্কগুলোতে বখাটেদের আড্ডা ও হকারদের দৌরাত্ম্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

আলোচনার একপর্যায়ে সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি পার্ক ও মাঠগুলোতে বিশেষ করে সকাল এবং সন্ধ্যায় মাদকসেবীদের আনাগোনা ও অবস্থান নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি সম্পূরক প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মাদকসেবীদের সান্নিধ্যে এসে কোমলমতি শিশুরা যেন মাদকের বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত না হয়, সেজন্য স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যৌথ ও কঠোর সমন্বিত পদক্ষেপ কী রয়েছে।

এই প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাদককে একটি বড় জাতীয় সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনায় ইতিমধ্যে সারা দেশে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের আইনের আওতায় আনার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। 

তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেন যে, শুধু আইনি বা পুলিশি অভিযান দিয়ে এই ভয়াবহ ব্যাধি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। মাদক পরিহার এবং এর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য দেশে একটি বড় ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার দেশের যুব সমাজ, ছাত্র সমাজ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে একটি বড় সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে বদ্ধপরিকর। সরকারের এই বহুমুখী উন্নয়ন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি খেলার মাঠ ও পার্ক অচিরেই পুরোপুরি নিরাপদ ও অবমুক্ত হবে এবং যুবসমাজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে বলে মন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়