বঙ্গোপসাগরে ভারতের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের ওড়িশা উপকূলের কাছে বঙ্গোপসাগরে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) ধরনের একটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ৮ মে শুক্রবার সন্ধ্যায় পরিচালিত এই পরীক্ষাটি ঘিরে ভারতীয় প্রতিরক্ষা মহল থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না এলেও নিরাপত্তা সূত্র এবং একাধিক আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে উঠে এসেছে।
টাইমস ওব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি অত্যন্ত গোপনীয় ও কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন একটি ট্রায়াল, যা ওড়িশা উপকূল সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় পরিচালিত হয় এবং আগে থেকেই নোটাম (NOTAM) জারি করে আকাশসীমা সীমিত রাখা হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরীক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্রটি ভারতের বহুল আলোচিত অগ্নি সিরিজের সর্বশেষ সংস্করণ ‘অগ্নি-৬’ কি না এ নিয়ে ব্যাপক জল্পনা তৈরি হলেও প্রতিরক্ষা সূত্রগুলো স্পষ্টভাবে এটিকে পৃথক একটি ICBM শ্রেণির অস্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে। বলা হচ্ছে, এর সম্ভাব্য পাল্লা সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি থেকে শুরু করে ১০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি হতে পারে, যা এটিকে আন্তঃমহাদেশীয় সক্ষমতার পর্যায়ে নিয়ে যায়। তবে বিষয়টি নিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা DRDO এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি, যা এই পরীক্ষাকে আরও বেশি কৌশলগত ও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
এই পরীক্ষার আগে থেকেই ভারতীয় প্রতিরক্ষা মহলে অগ্নি-৬ নিয়ে প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ইঙ্গিত স্পষ্টভাবে আলোচনায় ছিল। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সম্মেলনে ডিআরডিও–র শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করলেও সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। একই সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহল থেকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বার্তা দেওয়া হয় যে নতুন প্রজন্মের এই ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে। ফলে পরীক্ষাটিকে কেন্দ্র করে আগ্রহ ও উদ্বেগ উভয়ই বাড়তে থাকে।
আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী
পরীক্ষার সময় ও স্থানকে ঘিরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আঞ্চলিক পর্যবেক্ষণ। ভারতের পূর্ব উপকূলজুড়ে নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমার কারণে ক্ষেপণাস্ত্রটির গতিপথ বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের আকাশ থেকে দৃশ্যমান হয় বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি উঠে আসে। বিশেষ করে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, পিরোজপুর ও মাদারীপুরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আকাশে দীর্ঘ আলোকরেখার মতো একটি গতিশীল বস্তু দেখা যায়, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই এটিকে উল্কা বা অস্বাভাবিক কোনো আকাশীয় ঘটনা মনে করলেও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একটি অংশ এটিকে ভারতের পরীক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ট্রাজেক্টরি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইন্দুস্তান টাইমস।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই পরীক্ষাকে ভারতের কৌশলগত প্রতিরোধ সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি মূলত এমন একটি সক্ষমতা, যার মাধ্যমে দীর্ঘ দূরত্বে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব হয় এবং পারমাণবিক প্রতিরোধ নীতিতে এটি ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধ শক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এবং উত্তর কোরিয়ার কাছে পূর্ণাঙ্গ ICBM সক্ষমতা রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। ভারতের এই পরীক্ষাকে তাই বৈশ্বিক কৌশলগত ভারসাম্যের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একই সময়ে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ট্যাকটিক্যাল অ্যাডভান্সড রেঞ্জ অগমেন্টেশন (TARA) নামে একটি পৃথক প্রযুক্তির ফ্লাইট ট্রায়ালের কথাও জানিয়েছে, যা প্রচলিত অস্ত্রকে আরও নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে সক্ষম বলে দাবি করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্র ব্যবস্থাকেও উন্নত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরের এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না করলেও বিভিন্ন সূত্র, উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ, আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য মিলিয়ে এটি একটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার দিকেই ইঙ্গিত করছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা পরিস্থিতিতে এই ঘটনা নতুন করে কৌশলগত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








