মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: ড. ইউনূসসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বাহিনীর ভয়াবহ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মৃত্যুর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন করা হয়েছে।
অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি, প্রতারণা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যর্থতার অভিযোগ এনে বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে আবেদনটি করেন নিহত শিক্ষার্থী উক্য ছাইং মারমার বাবা উসাইমং মারমা।
আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড শেষে মামলাটি গ্রহণের বিষয়ে আদেশ অপেক্ষমাণ রেখেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী এ কে এম শারিফ উদ্দিন।
মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে অবহেলা ছিল। সেই অবহেলা ও ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার কারণেই ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
মামলায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়াও তৎকালীন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, সাবেক শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়ের, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, এয়ার ভাইস মার্শাল মোরশেদ মোহাম্মদ খায়ের উল আফসার, গ্রুপ ক্যাপ্টেন রিফাত আক্তার জিকু, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরনবী, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম, প্রশাসনিক প্রিন্সিপাল মাসুদ আলম, স্কুল শাখার প্রিন্সিপাল রিফাত নবী, রাজউকের চেয়ারম্যান এবং রাজউকের উত্তরা অঞ্চলের ফিল্ড সুপারভাইজারকে আসামি করার আবেদন জানানো হয়েছে।
মামলার আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ঘটনার সময় রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বিমান পরিচালনা, নিরাপত্তা তদারকি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বাদীর দাবি, বিমান বাহিনীর ত্রুটিযুক্ত প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল জেনেশুনেই। এছাড়া বিমানটির কারিগরি সক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিয়ে যথাযথ যাচাই না করেই সেটিকে প্রশিক্ষণ ফ্লাইটে ব্যবহার করা হয়।
আবেদনে বলা হয়, ঘটনার দিন দুপুরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিয়মিত ক্লাস চলছিল। দুপুর ১টা ৬ মিনিটের দিকে বীর উত্তম এ কে খন্দকার বিমান ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে বিমান বাহিনীর এফ-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমানটি। উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুরো এলাকা মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
আরও পড়ুন: তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
দুর্ঘটনার সময় ক্লাস শেষ হতে মাত্র কয়েক মিনিট বাকি ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ভবনের ভেতরে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অবস্থান করছিল।
মামলার আবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই দুর্ঘটনায় ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক এবং প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তাসহ মোট ৩৫ জন নিহত হন। পরে বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা ৩৬ জনে পৌঁছায় বলে উল্লেখ রয়েছে। আহত হন শতাধিক মানুষ, যাদের অনেকেই গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হয়ে স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, নিরাপদ বহির্গমন পথ এবং জরুরি উদ্ধার অবকাঠামো ছিল না। ভবনটি যথাযথ নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়নি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং অনেকে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান।
স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা ‘লোভের বশবর্তী হয়ে’ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে অনুপযুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। নিরাপদ সিঁড়ি, বিকল্প বহির্গমন পথ কিংবা জরুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা না রেখেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কারণে প্রাণহানির মাত্রা বেড়ে যায় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
রাজউক চেয়ারম্যান ও উত্তরা অঞ্চলের ফিল্ড সুপারভাইজারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, তারা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে অনিরাপদ ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হতো না।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ভবনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী না হওয়া সত্ত্বেও তারা অনুমোদন দিয়েছেন কিংবা নীরব থেকেছেন।
এছাড়া সাবেক শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়েরের বিরুদ্ধেও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার আবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ব্যর্থতার কারণেই অনুপযুক্ত ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চলতে পেরেছে।
সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, রিজওয়ানা হাসান, সি আর আবরার এবং সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার পর অগ্নিদগ্ধদের চিকিৎসা, উদ্ধার কার্যক্রম সমন্বয় এবং জরুরি সহায়তা প্রদানে তারা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বাদীর দাবি, আহতদের দ্রুত চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা গেলে হতাহতের সংখ্যা কমানো সম্ভব হতো।
মামলার আবেদনে আরও বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার পর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সর্বোচ্চ সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতারণার অভিযোগও যুক্ত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, দুর্ঘটনার পর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) প্রাথমিকভাবে জানায়, কারিগরি ত্রুটির কারণে যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হয়। পরে তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, প্রশিক্ষণার্থী পাইলটের উড্ডয়নজনিত ত্রুটিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ছিল। দুর্ঘটনায় বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম ইজেক্ট করতে সক্ষম হলেও পরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে শুরু থেকেই জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সামরিক প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনা, যুদ্ধবিমানের কারিগরি সক্ষমতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং উদ্ধার কার্যক্রমের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। এখন আদালতে দায়ের করা এই মামলার আবেদন সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








