News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:২২, ১৯ মার্চ ২০২৬

কাতারের গ্যাস স্থাপনায় ইরানের হামলায় ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ ৩ দেশ

কাতারের গ্যাস স্থাপনায় ইরানের হামলায় ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ ৩ দেশ

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই দফা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে কাতারের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি’। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্রটিতে ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির’ ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিশেষ করে কাতার-নির্ভর দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশ বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান এখন মারাত্মক বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও শিল্প বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে।

রাজধানী দোহা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার উত্তরে পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি কাতারের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এখান থেকেই দেশটির প্রায় সব তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানি করা হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি পরিচালিত এই কেন্দ্রটি শুধু এলএনজি নয়, ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়ার মতো সার, সালফার এবং মাইক্রোচিপ তৈরিতে অপরিহার্য হিলিয়ামের উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

উল্লেখ্য, এই স্থাপনাটি যে বিশাল গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ পায়, তার মালিকানা কাতার ও ইরান উভয়ের (কাতার অংশে ‘নর্থ ডোম’ এবং ইরান অংশে ‘সাউথ পার্স’)। 

কাতার এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, হিলিয়ামের বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২৫ শতাংশই এখান থেকে আসে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন-এর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক হামলায় এই স্থাপনার গ্যাস পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বন্দর সুবিধার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। যদিও কাতারএনার্জি চলতি মাসের শুরুতেই নিরাপত্তাজনিত কারণে উৎপাদন সাময়িক স্থগিত করেছিল, তবে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানায় স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে এখন প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’ ও ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল’-এর তথ্য অনুযায়ী, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানের ৯৯ শতাংশ, বাংলাদেশের ৭২ শতাংশ এবং ভারতের ৫৩ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ করে। একক দেশ হিসেবে পাকিস্তান তার মোট এলএনজি আমদানির ৯৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য কাতারের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ৪০ শতাংশের বেশি।

আরও পড়ুন: মার্কিন হামলার দায়ে আমিরাতের কাছে ইরানের বিশাল ক্ষতিপূরণ দাবি

ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রীয় কোম্পানি কাতারএনার্জি ‘ফোর্স মেজর’ (নিয়ন্ত্রণের বাইরের পরিস্থিতি) ঘোষণা করায় চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। বাংলাদেশে আগে থেকেই দৈনিক প্রায় ১৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি বিদ্যমান। 

পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, মার্চ মাসে নির্ধারিত ৯টি কার্গোর মধ্যে মাত্র ৪টি হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে। বাকি সরবরাহ বন্ধ থাকায় আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানাগুলো মারাত্মক সংকটে পড়বে। বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে চড়া মূল্যে গ্যাস কেনা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

রাস লাফান কেবল গ্যাসের উৎস নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের নিয়ন্ত্রক।

প্রযুক্তি খাত: বিশ্বের মোট হিলিয়াম সরবরাহের প্রায় ২৫ শতাংশ আসে এই কেন্দ্র থেকে। মাইক্রোচিপ ও সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে হিলিয়াম অপরিহার্য হওয়ায় বৈশ্বিক স্মার্টফোন ও কম্পিউটার উৎপাদন শিল্পে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

কৃষি খাত: এখান থেকে উৎপাদিত ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া সার সারাবিশ্বে রপ্তানি হয়, যা বন্ধ হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিবহন: ইরান একই সাথে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন রুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পখাত সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি জনজীবনে নাভিশ্বাস ওঠার আশঙ্কা প্রবল। রাস লাফানের ওপর এই হামলা কেবল একটি স্থাপনায় আঘাত নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সমান বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়