News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৪৫, ১৫ মার্চ ২০২৬

অবরুদ্ধ হরমুজ: ট্রাম্পের ডাকে সাড়া নেই মিত্রদের

অবরুদ্ধ হরমুজ: ট্রাম্পের ডাকে সাড়া নেই মিত্রদের

ছবি: সংগৃহীত

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের ১৫তম দিনে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট ‘হরমুজ প্রণালি’। ইরানের অবরোধের মুখে এই জলপথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিত্র দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে এখন পর্যন্ত আশাব্যঞ্জক কোনো সাড়া মেলেনি; বরং ফ্রান্স ও জাপানের মতো দেশগুলো সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে অনীহা প্রকাশ করেছে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দাবি করেন যে, ইরানের অবরোধ ভাঙতে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে একটি সামরিক জোট গঠন করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেসব দেশ এই রুট দিয়ে তেল পরিবহন করে, তাদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়ভার নিতে হবে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করেছে, যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে ইরান এখনো ড্রোন, মাইন বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম।

তবে ট্রাম্পের এই আহ্বানে বড় ধাক্কা দিয়েছে ফ্রান্স। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাথরিন ভৌথাঁ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা তাদের নেই। ফ্রান্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের বিমানবাহী রণতরী বর্তমানে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে কেবল রক্ষণাত্মক অবস্থানে রয়েছে এবং তারা কোনোভাবেই এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেবে না। একইভাবে জাপানও তাদের আইনি ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। জাপানের ক্ষমতাসীন দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই অঞ্চলে নৌবাহিনী পাঠানো অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ।

হরমুজ প্রণালিকে বলা হয় বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের ‘ধমনী’। এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং ২০ শতাংশের বেশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পৌঁছায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। জ্বালানির পাশাপাশি এই সংকট বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সার তৈরির প্রধান কাঁচামাল এলএনজি এই পথেই সরবরাহ করা হয়। সারের সংকট তৈরি হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হবে, যা বিশ্বের ক্যালোরি চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার সতর্ক করে বলেছেন, মানবিক সাহায্যবাহী পণ্যবাহী জাহাজগুলো যদি নিরাপদে পার হতে না পারে, তবে লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

প্রণালিটি কার্যত অবরুদ্ধ থাকলেও ইরান কৌশলগতভাবে কিছু দেশকে ছাড় দিচ্ছে। বিশেষ করে ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পর তেহরান তাদের জাহাজগুলোকে বিরল অনুমতি প্রদান করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে সরাসরি আলোচনার ফলে এলপিজি বহনকারী দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী ট্যাংকার নিরাপদে প্রণালি অতিক্রম করেছে। ভারতের ৩৩ কোটি ৩০ লাখ এলপিজি-নির্ভর পরিবারকে সংকটের হাত থেকে বাঁচাতে এই কূটনৈতিক তৎপরতা বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া আঙ্কারার অনুরোধে একটি তুর্কি মালিকানাধীন জাহাজকেও পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে ইরান, যদিও আরও ১৪টি জাহাজ ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কোনো সহজ সামরিক সমাধান নেই। কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগ জানিয়েছেন, কোনো কূটনৈতিক চুক্তি ছাড়া কেবল যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ ইরানের সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মুখে বহুমূল্যবান পশ্চিমা যুদ্ধজাহাজগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকবে। এছাড়া বিমা কোম্পানিগুলো শিপিং ঝুঁকি নিতে অস্বীকৃতি জানালে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে অন্তত ১,৪৪৪ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যুদ্ধের প্রভাব লেবাননসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলেই ছড়িয়ে পড়েছে। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই স্নায়ুযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহাবিপর্যয়ের দিকে মোড় নেয় কি না।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়