মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ‘চোখ’ উপড়ে ফেলল ইরান
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন আর কেবল বিমান হামলা বা সীমিত সামরিক অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধ ক্রমে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার ধ্বংস হয়েছে যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ব্লুমবার্গসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে মোতায়েন করা মার্কিন তৈরি এএন/টিপিওয়াই-২ রাডার যা ‘টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ ‘থাড’ (THAAD) ব্যবস্থার মূল উপাদান ইরানের হামলায় ধ্বংস হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবিতেও রাডার ও এর সহায়ক সরঞ্জামের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। মার্কিন এক কর্মকর্তাও পরে এই ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
থাড মূলত এমন একটি উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে ধেয়ে আসা দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে সেগুলোকে মাঝপথেই ধ্বংস করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলো শক্তিশালী এএন/টিপিওয়াই-২ রাডার, যার মাধ্যমে দূরবর্তী লক্ষ্য শনাক্ত করে প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রকে নির্ভুলভাবে পরিচালিত করা হয়। একটি রাডারের মূল্য প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার, আর সম্পূর্ণ একটি থাড ব্যাটারির মূল্য প্রায় ১০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের রাডার অত্যন্ত সীমিত সংখ্যায় তৈরি হয়েছে এবং দ্রুত প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বজুড়ে হাতে গোনা কয়েকটি থাড ব্যাটারি রয়েছে, ফলে একটি রাডারের ক্ষতিও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। এই রাডার ধ্বংস হওয়ার ফলে নির্দিষ্ট এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ সক্ষমতায় সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধে হুমকির মুখে মধ্যপ্রাচ্যের ‘লাইফলাইন’ ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট
প্রতিবেদনগুলো বলছে, ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়। ওই অভিযানে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামোসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। এর জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে।
শুধু জর্ডান নয়, কাতারসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরও কয়েকটি স্থানে মার্কিন নজরদারি ও সতর্কতামূলক রাডার অবকাঠামোতেও হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান পরিকল্পিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের “চোখ” বা নজরদারি ব্যবস্থাগুলোকে লক্ষ্য করছে, যাতে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণে অস্ত্র নির্মাতাদের সঙ্গে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধের অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত মতপার্থক্যের খবরও প্রকাশ্যে এসেছে। এক পর্যায়ে ইসরায়েল আকস্মিকভাবে ইরানের বেশ কয়েকটি জ্বালানি মজুতকেন্দ্রে হামলা চালায়- যার বিষয়ে ওয়াশিংটন আগাম অবহিত ছিল না বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন দ্রুত নতুন এক কৌশলগত পর্যায়ে প্রবেশ করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক অবকাঠামো দুর্বল করার চেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ইরান লক্ষ্যভিত্তিক হামলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের নজরদারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার কৌশল গ্রহণ করেছে। ফলে আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








