ইরান যুদ্ধে হুমকির মুখে মধ্যপ্রাচ্যের ‘লাইফলাইন’ ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এক ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর মোড় নিয়েছে। সামরিক স্থাপনা ছাড়িয়ে যুদ্ধের আগুন এখন গ্রাস করছে এ অঞ্চলের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন- সুপেয় পানির উৎসগুলোকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ত্রিমুখী যুদ্ধে এবার সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে ‘ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট’ বা সমুদ্রের পানি লবণাক্ততামুক্তকরণ কেন্দ্রগুলো। এর ফলে মরুপ্রধান এই দেশগুলোতে নজিরবিহীন পানিসংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত রবিবার (০৮ মার্চ) বাহরাইনের একটি পানি শোধনাগার ইরানি ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মাত্র একদিন আগে ইরান দাবি করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাদের কেশম দ্বীপের একটি পানি শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে অন্তত ৩০টি গ্রামের পানির সরবরাহ স্থগিত হয়েছে।
ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্টের কার্যপ্রণালী ও গুরুত্ব
ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট মূলত সমুদ্রের লবণাক্ত পানি থেকে লবণ ও দূষণ অপসারণ করে পানযোগ্য পানি তৈরি করে। প্রক্রিয়ায় প্রধানত দুটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়- তাপ প্রয়োগ করে পানি বাষ্পে রূপান্তর এবং পরে তরলে রূপান্তর, এবং মেমব্রেন প্রযুক্তি, বিশেষ করে ‘রিভার্স অসমোসিস’, যা লবণ ও অন্যান্য উপাদান আলাদা করে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে প্রধানত রিভার্স অসমোসিস প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হয়। বিশ্বের মোট ডিস্যালাইনেশন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) সদস্য দেশগুলো। এই অঞ্চলে উৎপাদিত পরিশোধিত সমুদ্রপানির পরিমাণ বিশ্বব্যাপী মোটের প্রায় ৪০ শতাংশ।
দেশভেদে নির্ভরতার হার অত্যন্ত বেশি। কুয়েতে সুপেয় পানির প্রায় ৯০ শতাংশ, ওমানে ৮৬ শতাংশ, সৌদি আরবে ৭০ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪২ শতাংশ পানি ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীল। এই দেশগুলোতে চার শতাধিক ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্ট কার্যকর রয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলার প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্টে হামলা শুধুমাত্র পানি সরবরাহকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে না, বরং পুরো অর্থনীতি ও মানবজীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে ১৯৯০–৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাক কুয়েতের বেশিরভাগ ডিস্যালাইনেশন স্থাপনা ধ্বংস করেছিল, যার ফলে পানি সংকট তৈরি হয়েছিল।
আরও পড়ুন: বাহরাইনের প্রধান তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা: ‘ফোর্স মজিউর’ ঘোষণা
বর্তমান পরিস্থিতিতে ছোট উপসাগরীয় দেশগুলো- বাহরাইন, কুয়েত ও কাতার সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ তাদের বিকল্প পানি উৎস সীমিত এবং কৌশলগত পানির মজুত কম। বড় দেশগুলো কিছুটা প্রস্তুতি নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় ৪৫ দিনের পানির মজুত রাখার পরিকল্পনা করেছে।
বিস্তৃত মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীলতা শুধুমাত্র পানি সরবরাহে প্রভাব ফেলে না; এটি কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পানিবিজ্ঞানী রাহা হাকিমদাভার জানিয়েছেন, এসব প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে শহরগুলোর পানি সরবরাহ দ্রুত কমে যেতে পারে, খাদ্য উৎপাদনে চাপ তৈরি হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে।
এছাড়াও, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে ভারতের ও ইউরোপের বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। কাতারের উৎপাদন স্থগিত থাকায় বিশ্ববাজারে গ্যাসের সরবরাহ অস্থির হয়ে পড়েছে এবং দাম একলাফে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে ভারতীয় কোম্পানিগুলো শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ ১০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে।
পানি নিরাপত্তার উপায় ও আঞ্চলিক সমাধান
বিশেষজ্ঞ নাসের আল সায়েদ মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর পানির নিরাপত্তাকে প্রতিটি দেশের আলাদা সমস্যা হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, আঞ্চলিক সমন্বয়, পানির গ্রিড তৈরি, জরুরি প্রয়োজনে যৌথভাবে পানি মজুত রাখা এবং পানি উৎস বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
নাসের আল সায়েদ এবং হাকিমদাভার উভয়ই উল্লেখ করেছেন, জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে ডিস্যালাইনেশনের বিকল্প নেই। ছোট দেশগুলোতে পানির প্রভাব সবচেয়ে বেশি হবে, এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও অপরিসীম। পানি মানুষের জীবনের জন্য অপরিহার্য, তাই সংকটের আশঙ্কা জনমনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।
উপসংহারে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র শুষ্ক জলবায়ু, পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, এবং চলমান সামরিক সংঘাত মিলিতভাবে একটি বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, যদি ডিস্যালাইনেশন প্ল্যান্টগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে থাকে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও খাদ্য–জল নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








