ঈদের আগে প্রবাসী আয়ের জোয়ারে শক্তিশালী হচ্ছে রিজার্ভ
ফাইল ছবি
আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবাহে বড় ধরনের সুবাতাস বইছে। পরিবার-পরিজনের ঈদের বাড়তি খরচ মেটাতে প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বা রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
চলতি মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহেই দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ১৬ মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট (গ্রোস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নির্ধারিত বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে এ রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে, গত বছরের মার্চে, দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ হিসাবে ২০ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, মোট রিজার্ভের পুরোটা ব্যবহারযোগ্য নয়। স্বল্পমেয়াদি দায় ও অন্যান্য বাধ্যবাধকতা বাদ দিলে যে নিট বা প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ থাকে, সেটিই দেশের অর্থনীতির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার, যা প্রতি মাসে গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানি ব্যয় ধরা হলে প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম। সাধারণভাবে তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভকে নিরাপদ ধরা হয়।
অতীতে রিজার্ভ চাপে পড়ে ব্যবহারযোগ্য অংশ ১৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। সেই সময় বৈদেশিক ঋণ ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার সংগ্রহের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি কমানো, হুন্ডি ও অর্থপাচার রোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা জোরদারের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এছাড়াও ডলারের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার ফলে চাপের মুখে থাকা রিজার্ভ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে ফিরে আসে। বর্তমানে দেশের রিজার্ভ ৩৩ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ঈদ উপলক্ষ্যে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে এবং রিজার্ভ শক্তিশালী হচ্ছে। বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। ডলার কেনার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ভালো অবস্থানে রয়েছে। ডলারের দর অতিরিক্ত কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; তাই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের রিজার্ভ ২০২১ সালের আগস্টে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলারে, যখন আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ২০ পয়সা। তবে পরবর্তী সময়ে ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম, অর্থপাচারসহ নানা কারণে রিজার্ভে চাপ তৈরি হয় এবং তা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে; আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী তখন রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়, ডলারের দাম বেড়ে ১২০ টাকার ওপরে উঠে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমদানিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ, আমদানি নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং প্রবাসী আয় বাড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। চলতি মার্চের প্রথম ১৪ দিনেই দেশে এসেছে ২২০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এর আগে ফেব্রুয়ারি, জানুয়ারি ও ডিসেম্বরের রেমিট্যান্স যথাক্রমে ৩০২ কোটি, ৩১৭ কোটি ও ৩২২ কোটি ডলার এসেছে, যা ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করছে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা রিজার্ভ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের নতুন বিনিয়োগ না থাকায় আমদানির চাপ কম ছিল, যা রিজার্ভ বাড়তে সহায়তা করেছে। তবে ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধি পেলে ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ থেকে রফতানি আয় বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে ডলার সংকট বড় আকার ধারণ করবে না। বরং বর্তমান ইতিবাচক প্রবণতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








