‘মব’ তৈরির সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে: মির্জা ফখরুল
ছবি: সংগৃহীত
টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল নির্বাচন আয়োজন বা সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক চর্চা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। গণতন্ত্র কোনো নিছক রাজনৈতিক স্লোগান বা ক্ষণস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, এটি মূলত একটি সামগ্রিক সংস্কৃতি। মানুষের চিন্তা, আচরণ এবং রাজনৈতিক চর্চার প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকলেই কেবল একটি কার্যকর ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।
শুক্রবার (০৭ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি হোটেল টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত টেকসই গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেন।
সেমিনারে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক আবদুল হাই সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজ) নেতৃবৃন্দসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের দীর্ঘ পথপরিক্রমা ও এর নানা চড়াই-উতরাই তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, স্বাধীনতাত্তর বাংলাদেশে কখনোই দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকেনি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বহুমুখী রাজনৈতিক চর্চার সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তবে বিভিন্ন সময়ে নানা রাজনৈতিক ও অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপে সেই অগ্রযাত্রা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, দলটি মুখে গণতন্ত্রের বুলি আউড়ালেও বাস্তবে দেশের সব কটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস ও দুর্বল করে দিয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন শাসনামলে দেশের পুরো রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক কাঠামো নজিরবিহীনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা নতুন সরকারের মেয়াদের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির মহাসচিব বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তাকে ব্যর্থ আখ্যা দেওয়া কিংবা আকস্মিক ক্ষমতা ছাড়ার দাবি তোলা কোনোভাবেই পরিপক্ক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের অবসান ঘটাতে হবে সংসদীয় আলোচনা এবং সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডার বা তড়িঘড়ি ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে রাজপথে নেমে এসে অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করা কিংবা একধরনের মব (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) তৈরির অপসংস্কৃতি গড়ে উঠছে, যা প্রকারান্তরে দেশের উদীয়মান গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
আরও পড়ুন: শহীদদের আত্মত্যাগে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ফখরুলের
সরকারকে সময় দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিগত প্রশাসনের রেখে যাওয়া এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের মুখোমুখি হয়েছে। গ্যাস খাত, বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত এবং ভঙ্গুর ব্যাংক ব্যবস্থাসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও সংকট তৈরি করা হয়েছিল। বিগত দিনে গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে শুধু আমদানিনির্ভর একটি পরনির্ভরশীল ব্যবস্থা জিইয়ে রাখা হয়েছিল। একইভাবে, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ক্ষত সৃষ্টি করা হয়েছে। ব্যাংক খাতকে এমন এক শোচনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে যে, সেগুলোকে পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে বর্তমান প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সমালোচনা করার অধিকার গণমাধ্যমের রয়েছে এবং সরকারকে সবসময় চোখে চোখে রাখতে হবে, ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতে হবে; তবে একই সঙ্গে সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ দিতে হবে। অস্থির না হয়ে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় না দিলে কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
সহনশীলতার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে মির্জা ফখরুল বলেন, টেকসই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত হলো ভিন্নমতের প্রতি পরম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। নিজের রাজনৈতিক আদর্শ বা মতের সঙ্গে পুরোপুরি মিল না থাকলেও, যেকোনো নাগরিক বা প্রতিপক্ষের স্বাধীন বক্তব্য প্রকাশের সাংবিধানিক ও নৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সমাজে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা যত বাড়বে, টেকসই গণতন্ত্রের পথ ততটাই সংকুচিত হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও দিকনির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, দলমত নির্বিশেষে সবাই যদি ধৈর্য ধরে এবং দেশগঠনে একযোগে কাজ করে, তবে খুব দ্রুতই বাংলাদেশকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র কখনো কল্পনা করা যায় না। শুধু সরকার একা নয়, বরং গণমাধ্যম, মালিকপক্ষ, কর্মরত সাংবাদিক এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকার মাধ্যমেই একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠে। গণমাধ্যমের মূল কাজ কেবল সরকারের ব্যর্থতা বা ত্রুটি খুঁজে বের করা নয়, বরং সরকারের বাস্তবসম্মত অর্জন, সাফল্য এবং গঠনমূলক উদ্যোগগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা উচিত। অনেক সময় বিভিন্ন টেলিভিশন টকশো বা সংবাদমাধ্যমে সরকারের নির্দিষ্ট কাসের বা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যর্থতাকে যেভাবে একক ও বড় শিরোনাম করা হয়, তাতে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। গণমাধ্যমের এই একমুখী বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় সরকারি কোনো প্রত্যক্ষ চাপ বা হস্তক্ষেপ না থাকলেও সংবাদকর্মীরা নিজেদের অজান্তেই আত্মনিয়ন্ত্রণ বা অতিরিক্ত আত্মসংযমের পথে হাঁটেন, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার বড় অন্তরায়। এছাড়া দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানা কাঠামো ও কঠিন আর্থিক বাস্তবতা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা। বহু ক্ষেত্রে মিডিয়া হাউজগুলোর মালিকপক্ষ বাণিজ্যিক বা আর্থিক স্বার্থে বিভিন্ন মহলের ওপর নির্ভরশীল থাকে, যা অনুসন্ধানী বা সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে একধরনের অদৃশ্য সংকোচ তৈরি করে।
সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, সম্মানজনক ও ন্যায্য বেতন-ভাতা এবং নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের নিজেদের পেশাগত অধিকার রক্ষায় আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং কোনো ধরনের আত্মসেন্সরশিপ ছাড়াই সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে অবিচল থাকতে হবে।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তীব্র বিস্তার ও এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া বর্তমানে অত্যন্ত শক্তিশালী অথচ একটি বিপজ্জনক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সামান্য একটি ছোট্ট ভিডিও ক্লিপ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট বা অপপ্রচার মুহূর্তের মধ্যে একজন মানুষের সারা জীবনের সম্মান, মেধা ও অর্জনকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। এই ধরনের ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে আজ উন্নতবিশ্বসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কঠোর বিধিনিষেধ বা আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও জাতীয় স্বার্থে এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার রোধে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








