বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরাতে সক্রিয় দুদক
ফাইল ছবি
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে গ্রেপ্তার হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত চূড়ান্ত করতে কাজ করছে সংস্থাটি। গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) বাংলাদেশের এনসিবিকে ই-মেইলের মাধ্যমে গ্রেফতারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে। এরপর থেকেই সরকার ও দুদক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগোচ্ছে।
ইউএইর ফেডারেল আইন নম্বর ৩৯/২০০৬-এর ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকারকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে।
আবুধাবি এনসিবি জানিয়েছে, এই আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত প্রতিটি নথিপত্র অবশ্যই আরবি ভাষায় অনূদিত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর ও সিলমোহরযুক্ত হতে হবে। আবেদনে বেনজীর আহমেদের বিস্তারিত ব্যক্তিগত পরিচিতি, ছবি, জাতীয়তা, ঠিকানাসহ তার বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, অপরাধের স্থান ও প্রকৃতি, প্রযোজ্য আইন এবং সংশ্লিষ্ট আদালত কর্তৃক জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা বা দণ্ডাদেশের সত্যায়িত অনুলিপি অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ চলছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানো হবে।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে মোট ছয়টি মামলা চলমান রয়েছে, যার মধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানিলন্ডারিং ও পাসপোর্ট জালিয়াতি অন্যতম। দুদকের অনুসন্ধানে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া তার বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্যও বেরিয়ে এসেছে। আইনি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে তার অনেক সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে রাজধানীর গুলশানে বেনজীরের মালিকানাধীন একটি ভবনের দুটি ফ্লোরের চারটি ফ্ল্যাট দুদক ক্রোক করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নেয়। তবে এসব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জটিলতা রয়েছে। গুলশানের ফ্ল্যাটগুলো থেকে ভাড়া আয়ের সম্ভাবনা থাকলেও এখনো সেগুলো ভাড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন: দুবাই পুলিশের হাতে যেভাবে গ্রেফতার হলেন বেনজীর আহমেদ
অন্যদিকে, গোপালগঞ্জের সাভানা ইকো রিসোর্টটি স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে এবং সেখান থেকে অর্জিত রাজস্ব নিয়মিতভাবে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হচ্ছে। দুবাইয়ে থাকা তার একটি ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাবও ইতিমধ্যে জব্দ করা হয়েছে।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে করা মামলার মধ্যে অন্যতম একটি হলো ১২ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর করা মামলা, যেটিতে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়।
ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, বেনজীর আহমেদ পুলিশের উচ্চপদে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও দাপ্তরিক পরিচয় গোপন করে প্রতারণামূলকভাবে সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণ করেছিলেন। এই জালিয়াতি প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তৎকালীন কর্মকর্তাদের যোগসাজশের বিষয়টিও তদন্তে এসেছে। এর আগে, গত বছরের ১০ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল ‘রেড নোটিশ’ জারি করেছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে সংসদ অধিবেশনে জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বেনজীর আহমেদকে আইনের আওতায় আনতে ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছে। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের আবেদনের প্রেক্ষিতেই ইন্টারপোল রেড নোটিশ ইস্যু করে এবং এরই ধারাবাহিকতায় আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা বলছেন, বিদেশে পলাতক কোনো অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে নথিপত্রের যথার্থতা ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভুলভ্রান্তি বা অসম্পূর্ণ তথ্য থাকলে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া জটিল ও দীর্ঘায়িত হতে পারে। তাই দুদক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নথিপত্র প্রস্তুত ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে পুরো জাতি এখন তাকিয়ে আছে এই আইনি প্রক্রিয়ার দিকে, যাতে বহুল আলোচিত এই ব্যক্তির বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








