নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:১৩, ৪ জুন ২০২৬

বিএসইসি চেয়ারম্যানসহ চার কমিশনারের পদত্যাগ

বিএসইসি চেয়ারম্যানসহ চার কমিশনারের পদত্যাগ

ছবি: সংগৃহীত

নানামুখী চাপ, বিতর্ক, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টানা আন্দোলনের মুখে অবশেষে একযোগে পদত্যাগ করেছেন পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ চারজন কমিশনার। 

বৃহস্পতিবার (০৪ জুন) সকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে তারা পৃথকভাবে এই পদত্যাগপত্র জমা দেন। 

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মূলত ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তারা পদত্যাগ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। 

চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সঙ্গে পদত্যাগকারী অন্য চার কমিশনার হলেন মু. মহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ এবং মো. সাইফুদ্দিন। দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজারে চলমান অস্থিরতা ও বিনিয়োগকারীদের টানা প্রতিবাদের পর অবশেষে দেশের শীর্ষ এই শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় এই বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘটনা ঘটল।

বিএসইসিতে পদত্যাগকারী এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট খন্দকার রাশেদ মাকসুদ চার বছরের মেয়াদে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এর আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে সংস্থাটির কমিশনাররা নিয়োগ পান। যার মধ্যে মু. মহসীন চৌধুরী ২০২৪ সালের ২ জুন, মো. আলী আকবর একই বছরের ২৮ আগস্ট এবং ফারজানা লালারুখ ৩ সেপ্টেম্বর কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন। এছাড়া এই পর্ষদের সর্বশেষ সদস্য হিসেবে ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই কমিশনারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন মো. সাইফুদ্দিন। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই, দেশের পুঁজিবাজারের ক্রান্তিলগ্ন এবং অভ্যন্তরীণ তীব্র অসন্তোষের মুখে পুরো কমিশনকে বিদায় নিতে হলো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার বিএসইসি পর্ষদের এই গণপদত্যাগের পটভূমি তৈরি হয়েছিল মূলত গত ২ জুন। ওই দিন রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক একটি সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বর্তমান সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বিএসইসি পুনর্গঠনের একটি স্পষ্ট ঘোষণা দেন। 

আরও পড়ুন: ঈদযাত্রায় ১৩ দিনে ২৯২ দুর্ঘটনা: প্রাণহানি ২৮১, আহত ৮৩৭

মন্ত্রীর এই প্রকাশ্য বিবৃতির পর থেকেই পুঁজিবাজার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভ্যন্তরে ব্যাপক রদবদলের জোর গুঞ্জন ও আলোচনা শুরু হয়। সরকারের উচ্চপর্যায়ের এই অনমনীয় বার্তার পর শেষ পর্যন্ত আজ সকালে চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা একযোগে পদত্যাগপত্র জমা দিতে বাধ্য হন। 

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আজই শূন্য পদগুলোতে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এই পদের জন্য একটি শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম জোরেসোরে আলোচনায় রয়েছে।

বিএসইসির শীর্ষ পর্যায়ের এই পরিবর্তনের দাবিতে গত কয়েক মাস ধরেই সংস্থাটির ভেতরে ও বাইরে তীব্র আন্দোলন চলছিল। খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগের দাবিতে বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘ সময় ধরে কর্মবিরতি, বিক্ষোভ সমাবেশসহ বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। কর্মকর্তাদের এই প্রশাসনিক অচলাবস্থার পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ভবনের সামনে এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় টানা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে কমিশন পুনর্গঠনের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ ছিল, বর্তমান কমিশনের ব্যর্থতার কারণে বাজারে লাগাতার অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং তারা বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এদিকে পদত্যাগের পর খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পক্ষ থেকে বিএসইসির মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে তিনি বিদায়লগ্নে তার মেয়াদের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সংস্কার কার্যক্রমের খতিয়ান তুলে ধরেন। 

রাশেদ মাকসুদ দাবি করেন, ২১ মাস আগে দেশের একটি অত্যন্ত অস্থির সময়ে তিনি এই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বাজারের আইনি কাঠামো ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। তার সংক্ষিপ্ত মেয়াদে বিএসইসি পাঁচটি নতুন বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি করপোরেট গভর্ন্যান্স, নিরীক্ষা ও করপোরেট পুনর্গঠন সংক্রান্ত তিনটি খসড়া নির্দেশিকা এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন ও ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনের খসড়াও জনমতের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। বাজারে সব ধরনের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ দূর করে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মধ্যস্থতাকারী ও ইস্যুকারীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরিতে তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেন। তবে এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিদায়ের পর দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কেটে নতুন ও ইতিবাচক হাওয়া ফিরবে বলে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকরা আশা প্রকাশ করছেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়