রামিসা হত্যা মামলার রায় ৭ জুন
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারিক কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য আগামী রবিবার (০৭ জুন) দিন ধার্য করেছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (০৪ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন উভয় পক্ষের বক্তব্য ও আইনি ব্যাখ্যা গ্রহণ করে রায়ের এই তারিখ নির্ধারণ করেন।
এদিন বেলা ১১টার পর বিচারক এজলাসে উঠলে এই মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। এর আগে মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। সকাল ৯টার দিকে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা (৩১) ও তার স্ত্রী তথা সহযোগী আসামি স্বপ্না খাতুন ওরফে স্বপ্না আক্তারকে (২৬) মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানা থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় সংক্ষুব্ধ পরিবার ও সচেতন মহলের মধ্যে এখন ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
এর আগে গত বুধবার (০৩ জুন) মামলার আত্মপক্ষ সমর্থন ও ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল।
ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ এবং রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলুর দেওয়া তথ্যমতে, বুধবারের শুনানিতে বিচারক মাসরুর সালেকীন মামলার ১৬ জন সাক্ষীর গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি, ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রতিবেদন, ভিডিও প্রমাণ এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আলামত আসামিদের সামনে উপস্থাপন করেন। আত্মপক্ষ সমর্থনের ওই শুনানিতে শুরুতে আসামিরা নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন।
প্রধান আসামি সোহেল রানা একপর্যায়ে আদালতে বলেন, আমি নির্দোষ স্যার। স্যার, আমাকে মাফ করে দিন।
তবে এর পরপরই তিনি রহস্যজনকভাবে নতুন একটি চরিত্রের অবতারণা করে বলেন, ডলারকে ধরেন। আমি অপরাধ করেছি। তাকেও ধরেন।
অন্যদিকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার দাবি করেন, আমি কিছু করিনি।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু জানান, শুরুতে অস্বীকার করলেও পরে সোহেল রানা নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, যা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালের নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন জানানো হয়েছে। এছাড়া ‘ডলার’ নামের যে ব্যক্তির কথা শেষ মুহূর্তে বলা হয়েছে, তা নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই; কারণ সোহেল রানার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া পূর্বেকার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি কিংবা মামলার তদন্ত নথির কোথাও এই নামের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: ১৩ মাস পর কারাবাস থেকে মুক্তি পেলেন আইভী
মূলত বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যেই শেষ সময়ে এই নাম ছড়ানো হয়ে থাকতে পারে বলে রাষ্ট্রপক্ষ মনে করে। আসামিপক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ জানান, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ৩৪২ ধারায় আসামি পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পরেই আদালত আজ যুক্তিতর্কের দিন ধার্য করেছিলেন।
আইনি প্রক্রিয়ার বিবরণ থেকে জানা যায়, অত্যন্ত দ্রুতগতির এই বিচার প্রক্রিয়ায় গত ২৪ মে ট্রাইব্যুনাল দুই আসামির বিরুদ্ধে দাখিল করা অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আমলে নেয়। একই দিনে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান (ওয়াহিদুজ্জামান) ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে প্রধান আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণ, হত্যা ও আলামত নষ্ট করার এবং তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে আলামত নষ্ট, অপরাধে সহযোগিতা ও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সেদিনই মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে (শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল) স্থানান্তর করেন। এরপর গত সোমবার (০১ জুন) ট্রাইব্যুনাল এই দম্পতির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। অভিযোগ গঠনের পরদিনই অর্থাৎ গত মঙ্গলবার (০২ জুন) চার্জশিটভুক্ত মোট ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করার মাধ্যমে সাক্ষ্য পর্ব শেষ করা হয়।
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া ১৬ জনের মধ্যে ছিলেন নিহত শিশুটির বাবা-মা, প্রতিবেশী, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, একজন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।
বিশেষত, নিহত শিশুর বড় বোন একজন শিশু সাক্ষী হওয়ায় ক্যামেরা ট্রায়ালের (রুদ্ধদ্বার কক্ষ) মাধ্যমে তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এছাড়া তদন্তকালে জব্দ করা রক্তমাখা ও কাটা গ্রিলসহ বিভিন্ন বস্তুগত আলামতও সফলভাবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটেছিল গত ১৯ মে। মামলার নথি ও পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, নিহত রামিসা আক্তার মিরপুরের পল্লবীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে নিজ ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না খাতুন তাকে কৌশলে তাদের রুমের ভেতরে ডেকে নেয়। এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার স্কুলে যাওয়ার সময় হলে তার মা তাকে ঘরে না পেয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে আসামিদের রুমের সামনে শিশু রামিসার পরনের জুতা জোড়া দেখতে পান তিনি। এতে সন্দেহ হওয়ায় ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা সম্মিলিতভাবে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকে তারা শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন এবং ঘরের ভেতরে থাকা একটি বড় বালতির মধ্য থেকে তার খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করেন। এই নৃশংস দৃশ্য দেখে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল করা হলে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেয়। তবে ঘটনার পর প্রধান আসামি সোহেল রানা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও পুলিশ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার পরদিনই নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে সোহেল রানা আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। এই ঘটনায় গত ২০ মে নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে আসামি করে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এই মামলার সার্বিক অগ্রগতি ও প্রত্যাশা নিয়ে ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এটি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুততম বিচার প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য হবে। রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সমস্ত তথ্য-প্রমাণ, ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছে। এই অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। এমন দৃষ্টান্তমূলক রায় আসবে, যা ভবিষ্যতে সমাজ থেকে এই ধরনের জঘন্য ও পৈশাচিক অপরাধের মানসিকতা চিরতরে নির্মূল করবে এবং কেউ আর কোনো শিশুর ওপর এমন বর্বরতা চালানোর সাহস পাবে না। বর্তমানে পুরো দেশ এবং রামিসার শোকসন্তপ্ত পরিবার আগামী ৭ জুনের চূড়ান্ত রায়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








