বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধবিরতি নিয়ে তৈরি হওয়া গভীর অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার। টানা দুই কার্যদিবস দরপতনের পর সপ্তাহের ব্যবধানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় বেশ খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক ধোঁয়াশার পাশাপাশি মার্কিন প্রশাসনের অনমনীয় অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার যৌথ প্রভাবেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গ্রিনিচ মান সময় (GMT) বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম ব্যারেলপ্রতি ৮১ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য গিয়ে দাঁড়ায় ১০৫ দশমিক ৮৩ ডলারে। প্রায় একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার ‘ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট’ (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও সমহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডব্লিউটিআই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৭ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ বেড়ে লেনদেন হয়েছে ৯৯ দশমিক ২৩ ডলারে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করছে, যা বাজারে চাহিদার বিপরীতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
আরও পড়ুন: টানা তিন দফা কমলো সোনার দাম
জ্বালানি খাতের বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইরান পরিস্থিতি নিয়ে চলমান ভূরাজনৈতিক সংকটই এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতায় আসার সম্ভাবনা ক্রমান্বয়ে ক্ষীণ হয়ে আসায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে। এর বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে আগুন উসকে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত হ্রাসের খবর। মার্কিন বাজারে তেলের অভ্যন্তরীণ মজুত কমে যাওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, যা মূলত তেলের দামকে রাতারাতি ঊর্ধ্বমুখী করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
এদিকে, ইরান ইস্যুতে মার্কিন প্রশাসনের অনমনীয় ও কঠোর অবস্থান এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তেহরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত, গ্রহণযোগ্য এবং টেকসই চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত ইরানের ওপর আরোপিত বিদ্যমান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিলের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। ওয়াশিংটন এবং হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও এই বিষয়ে একই ধরনের কঠোর ও অনমনীয় বার্তা দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন চলমান আলোচনার মধ্যেই পরিষ্কার করেছে যে, ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রাখতেই এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হবে এবং কোনো অবস্থাতেই ওয়াশিংটন তেহরানকে ছাড় দিতে রাজি নয়।
ইরান সংকট নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো বা তড়িঘড়ি করতে রাজি নন বলে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। নিজের শর্ত অনুযায়ী একটি নিখুঁত ও ফলপ্রসূ চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে একটি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য তিনি প্রয়োজনে আরও কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ বা তার চেয়েও বেশি সময় অপেক্ষা করতে প্রস্তুত আছেন। মার্কিন প্রশাসনের এই অনমনীয় মনোভাব এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে ইরানকে ঘিরে চলমান ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত হচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। ভূরাজনৈতিক এই অস্থিরতা দ্রুত প্রশমিত না হলে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








