সংসদে মামুনুল হক প্রসঙ্গ: স্পিকারের বক্তব্যসহ সব বিতর্কিত মন্তব্য এক্সপাঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে দেওয়া বিতর্কিত বক্তব্য ও পরবর্তীতে এ বিষয়ে দেওয়া নিজের পর্যবেক্ষণ উভয়ই সংসদীয় কার্যবিবরণী (প্রসিডিংস) থেকে এক্সপাঞ্জ (বাদ দেওয়া) করেছেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
রবিবার (২১ জুন) জাতীয় সংসদ অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সংসদীয় বিতর্কে ব্যক্তির সম্মান রক্ষা ও সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করলেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার বাজেট আলোচনা চলাকালে। সেদিন ঢাকা-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য (বিএনপি) খোন্দকার আবু আশফাক তার বক্তৃতায় মাওলানা মামুনুল হকের ব্যক্তিগত জীবন ও কথিত পরকীয়ার প্রসঙ্গ টেনে আনেন।
মাওলানা মামুনুল হককে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তিনি বাজেট নিয়ে সরকারের পতন ঘটানোর হুমকি দিচ্ছেন, কিন্তু তিনি যে মুতা বিয়ের নামে এক নারীকে নিয়ে ধরা পড়েছিলেন, সেটা আসলে কী ছিল?
তার এই বক্তব্যের সময় তিনি মুতা বিয়ের বিষয়ে স্পিকারের কাছে ব্যাখ্যাও জানতে চান। ওই সময় সংসদে উপস্থিত বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এবং বিষয়টির প্রতিবাদ করেন।
এহেন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সেদিন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘মাওলানা মামুনুল হকের এ বিষয়টি সংসদের কার্যবিবরণীতে আসার প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া তিনি এখনো তার অবস্থান পরিষ্কার করেননি। একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের অন্ধকার অংশ এখানে আলোচিত হোক, তা আমরা চাই না।’ স্পিকার সেদিন আরও মন্তব্য করেছিলেন, সংসদের বাইরে কোনো রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এই ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করা সমীচীন নয়, বিশেষ করে যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান না।
রবিবার অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার নিজের দেওয়া ওই বক্তব্য এবং খোন্দকার আবু আশফাকের বিতর্কিত মন্তব্য উভয়ই কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেন।
স্পিকার বলেন, গত বৃহস্পতিবার ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা মামুনুল হকের কথিত পরকীয়া নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন, যা ছিল অনভিপ্রেত। সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি সংসদে উপস্থিত হয়ে নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন না, তার সম্পর্কে এ ধরনের বিরূপ মন্তব্য করা অনুচিত। তাই আমি ওই সংসদ সদস্যের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেছি।
আরও পড়ুন: মোহাম্মদপুরের অপরাধীদের নির্মূল করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
নিজের বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্পিকার আরও বলেন, বাজেট বক্তৃতার সময় আমি উল্লেখ করেছিলাম যে, কোনো ব্যক্তির জীবনের অন্ধকার অধ্যায় সম্পর্কে বক্তব্য এসেছে। সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখতে এবং যার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই তার সম্মান রক্ষার্থে আমার নিজের সেই বক্তব্যটিও এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দিয়েছি।
ভবিষ্যতে বাজেট আলোচনা বা অন্য যেকোনো বিতর্কে সংসদ সদস্যদের অধিকতর সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার স্পষ্টভাবে বলেন, যার পক্ষে নিজেকে ডিফেন্ড করা সম্ভব নয়, তাঁর উদ্দেশে কোনো বিরূপ মন্তব্য করবেন না, এটাই আমি প্রত্যাশা করি।
এদিকে, একই অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে অন্যান্য সংসদীয় বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দীন গত ১৪ জুন নীলফামারী-৪ আসনের এমপি আবদুল মুনতাকিমের বক্তব্যের সূত্র ধরে দাবি করেন যে, মুনতাকিম নিজেকে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ বলে যে দাবি করেছিলেন তা অসত্য।
জবাবে স্পিকার জানান, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য তার সাথে দেখা করে জানিয়েছেন যে এটি নিছক একটি ‘স্লিপ অব টাং’ বা অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল এবং তার পিতা জীবিত আছেন। ভুল স্বীকার করায় সেই অংশটিও কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন স্পিকার।
অধিবেশনের অন্য এক পর্যায়ে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান রতন বিরোধীদলীয় নেতার একটি সফরকালীন বক্তব্যের সমালোচনা করেন।
তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তা নাকচ করে দিয়ে জানান যে, সংসদের বাইরে দেওয়া বক্তব্যের জবাব সংসদের ভেতরে প্রয়োজন নেই এবং বাক-স্বাধীনতার প্রতি সম্মান রেখে তিনি সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধির ২৭৪-এর আওতায় সংশ্লিষ্ট সদস্যদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
পরিশেষে, সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে এ ধরনের ব্যক্তিগত বিতর্কিত মন্তব্য বাদ দেওয়া এবং স্পিকারের এই কঠোর বার্তা জাতীয় সংসদের মর্যাদা ও আলোচনার মান উন্নয়নে একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








