নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:৫০, ২১ জুন ২০২৬

হাম ও উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু

হাম ও উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু

ফাইল ছবি

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। টিকা কার্যক্রম শুরুর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হয়নি; উল্টো প্রতিদিন বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা। সরকারি তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সবমিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ২১ জুন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে মোট ৬৮০ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গতানুগতিক পদ্ধতিতে এই সংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সংক্রমণের এই লাগামহীন বিস্তার ঘটছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ৭৯০ জনে। এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট পরীক্ষায় ১১ হাজার ১১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ৫শ ৮৭ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। সংক্রমণের এই দীর্ঘ সময়ে মোট ৭৬ হাজার ৮৫৯ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৭২ হাজার ৮৪৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬২ জনের দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং ১ হাজার ১ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে।

হামের এই ভয়াবহতা মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক মাহমুদুর রহমান বলেন, হামের মতো একটি সংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলায় যে ধরনের ব্যাপক প্রচার ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের প্রয়োজন ছিল, বাস্তবে তার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের আইসোলেশনে রাখা, হাত ধোয়াসহ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মানার বার্তাগুলো সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে যথাযথভাবে পৌঁছানো যায়নি। 

আরও পড়ুন: হাম উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু

তিনি আরও উল্লেখ করেন, কোভিড মহামারীর সময় যে ধরনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও তৎপরতা দেখা গিয়েছিল, হামের ক্ষেত্রে তা নেই বললেই চলে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন সরকারের কৌশলের সমালোচনা করে বলেন, গতানুগতিকভাবে শুধু হাসপাতালে কিছু আইসিইউ স্থাপন ও চিকিৎসকের ব্যবস্থা করেই দায় সারা হচ্ছে, যা এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র আইসিইউর সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই, দক্ষ জনবল ছাড়া সেগুলো কার্যকর করা সম্ভব নয়। শিশুদের উপযোগী আইসিইউ ব্যবস্থা এবং অক্সিজেন সাপোর্ট সহজলভ্য করা জরুরি। তবে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুকে যেন আইসিইউ পর্যন্ত পৌঁছাতে না হয়। এজন্য উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, অক্সিজেন থেরাপি নিশ্চিত করা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে আক্রান্তদের আইসোলেশন ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্রটোকলের অভাব। উপজেলা থেকে শুরু করে বেসরকারি পর্যায় পর্যন্ত চিকিৎসকদের জন্য সমন্বিত কোনো নির্দেশনা না থাকায় চিকিৎসা সেবায় ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে। এছাড়া, শিশুমৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে কোনো ডেথ রিভিউ বা ক্লিনিক্যাল অডিট না হওয়ায় একই ভুল বারবার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, সরকার গত ৫ এপ্রিল থেকে পর্যায়ক্রমে দেশের ১৮টি জেলা, ৩০টি উপজেলা এবং সিটি করপোরেশনগুলোতে টিকা কার্যক্রম শুরু করে, যা পরবর্তীতে দেশজুড়ে বিস্তৃত করা হয়। তবে টিকা কার্যক্রমের পাশাপাশি সমন্বিত সামাজিক সচেতনতা, কার্যকর প্রচার এবং তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত না করতে পারলে হামের এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়