দেশজুড়ে বৃষ্টির পূর্বাভাস, বর্ষাতেও থাকবে ভ্যাপসা গরম
ফাইল ছবি
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করেছে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা বর্ষাকাল। চলতি বছর স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় এক সপ্তাহ পিছিয়ে গত শনিবার দুপুরে টেকনাফ উপকূল হয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রবেশ করে এই মৌসুমি বায়ু।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এটি ইতিমধ্যে দেশের অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় বিস্তার লাভ করেছে। তবে দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় লঘুচাপের সক্রিয়তার কারণে মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার ফলে বর্ষার চেনা রূপে একটানা বৃষ্টি না হয়ে এখন পর্যন্ত থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এই মৌসুমি বায়ু দেশের বাকি অংশেও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনুকূল আবহাওয়া বিদ্যমান রয়েছে, যার প্রভাবে দেশজুড়ে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমা মৌসুমি বায়ু ইতিমধ্যে বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুর বিভাগজুড়ে বিস্তার লাভ করেছে। দেশের বাকি এলাকাগুলোতে আগামী দু-এক দিনের মধ্যে এটি সক্রিয় হয়ে উঠবে। সাধারণত দেশের মোট বৃষ্টিপাতের ৮০ ভাগের বেশি হয়ে থাকে এই মৌসুমি বায়ুর কারণে। তবে এ বছর বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর অন্যতম নিয়ন্ত্রক ‘এল নিনো’ সক্রিয় থাকায় বর্ষা মৌসুমে সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম বৃষ্টিপাত হতে পারে।
বিপরীতে, এ বছরের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস হিসেবে পরিচিত এপ্রিল ও মে মাসে দেশে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে; বিশেষ করে এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। কিন্তু জুন ও জুলাই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। এল নিনোর প্রভাবে বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অত্যধিক বেড়ে যাবে, যার ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও মানুষের শরীরে অনেক বেশি ভ্যাপসা গরম ও অস্বস্তি অনুভূত হবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য আবহাওয়া অধিদপ্তর বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। বুধবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত দেশের ১২টি অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অঞ্চলগুলো হলো রাজশাহী, পাবনা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, কুমিল্লা এবং সিলেট। এসব এলাকার ওপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টিসহ ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া আগামী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও তীব্র বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী (২২-৪৩ মিলিমিটার) থেকে ভারী (৪৪-৮৮ মিলিমিটার) বর্ষণ হতে পারে।
তাপমাত্রা পরিস্থিতির বিষয়ে আবহাওয়া অফিস জানায়, বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং অন্যত্র তা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে রাতের তাপমাত্রা সারা দেশেই সামান্য বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের প্রতিটি বিভাগেই কমবেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে উপকূলীয় ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা সবচেয়ে বেশি ছিল। এ সময়ে দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায়, যার পরিমাণ ছিল ১০৬ মিলিমিটার। এ ছাড়া চাঁদপুরে ৬৭ মিলিমিটার, সিলেটে ৫৮ মিলিমিটার এবং কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই সময়ে রাজধানী ঢাকায় সামান্য বৃষ্টিপাত হলেও আকাশ মূলত মেঘাচ্ছন্ন ছিল এবং আজ বুধবারও রাজধানীতে আরও বৃষ্টিপাতের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: দেশজুড়ে বিনামূল্যে ১৬ লাখ ২৮ হাজার চারা বিতরণ করবে সরকার
তাপমাত্রার দিক থেকে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে খুলনা বিভাগের যশোরে, যা ছিল ৩৭.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যৌথভাবে ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ, নওগাঁর বদলগাছী এবং নোয়াখালীর রামগতিতে, যা ছিল ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সাধারণত দেশের একাধিক জেলায় তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে আবহাওয়া অধিদপ্তর মৃদু তাপপ্রবাহ ঘোষণা করে থাকে। সেই হিসেবে গত সোমবার দেশের পাঁচ জেলার ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে গেলেও মঙ্গল ও বুধবারের বৃষ্টিপাতের প্রলেপে সেই তাপপ্রবাহ অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের দিনগুলোর তুলনায় সারা দেশেই তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে কমছে। যেমন, মঙ্গল ও বুধবারে রাজধানীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আগের দিনগুলোর চেয়ে বেশ কম।
আবহাওয়া অধিদপ্তর আজ সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার যে দিনভিত্তিক আবহাওয়া পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে, তা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
প্রথম দিন (১০ জুন): রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়া ও বজ্রপাতসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ভারী থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমলেও দেশের অন্যত্র অপরিবর্তিত থাকবে এবং রাতের তাপমাত্রা সারা দেশে সামান্য বাড়বে।
দ্বিতীয় দিন (১১ জুন): এই দিনে দেশের উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টির আওতা আরও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে রাজশাহী বিভাগে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়বে। রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে।
তৃতীয় দিন (১২ জুন): আগের দিনের তুলনায় রাজশাহী বিভাগে বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমতে পারে। তবে রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি ও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা বজায় থাকবে। এ দিন সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে, তবে রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে।
চতুর্থ দিন (১৩ জুন): বৃষ্টিপাতের ধরন, তীব্রতা ও বিস্তৃতি আগের দিনের মতোই অপরিবর্তিত থাকবে। রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় এবং দেশের অন্যান্য বিভাগের কিছু কিছু এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি ও কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণ হতে পারে। দেশের দিন ও রাতের তাপমাত্রা পরিস্থিতি তৃতীয় দিনের মতোই থাকবে, অর্থাৎ দিনের তাপমাত্রা সামান্য চড়া থাকতে পারে।
পঞ্চম দিন (১৪ জুন): এই দিনেও আবহাওয়ার বড় কোনো পরিবর্তন নেই। রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্থিতিশীল থাকবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে যে, এই নির্ধারিত ৫ দিনের সময়সীমা পার হওয়ার পর দেশজুড়ে মৌসুমি বায়ু সম্পূর্ণ সক্রিয় হয়ে উঠবে, যার ফলে দেশের সব অঞ্চলেই বৃষ্টিপাতের প্রবণতা এবং পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








