সর্বগ্রাসী বন্যা ও ভাঙনের অন্তহীন বৃত্তে তিস্তাপাড়ের জীবন
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
তিস্তার পানি বাড়লেও হামার বিপদ, কমলেও হামার বিপদ উত্তরের প্রমত্তা তিস্তা নদীর নিষ্ঠুর বাস্তবতার এটাই নিখুঁত চিত্র। নদীর পানি বাড়লেই নেমে আসে সর্বগ্রাসী বন্যা, আর কমলেই শুরু হয় ভিটেমাটি গ্রাসকারী তীব্র নদীভাঙন। বন্যা ও ভাঙনের এই নিত্যসঙ্গী কষাঘাতে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন রংপুর অঞ্চলের তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষ। লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা এই পাঁচ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী এখন এ অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবারের স্থায়ী দুর্ভোগ ও কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার পশ্চিম হরিণচড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল বাকী জানান, গত বুধবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিস্তার পানি আকস্মিক বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে। যদিও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে, তবুও বুধবার বিকেলেই গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় গবাদি পশু নিয়ে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে হয়েছে। বিশেষ করে জমিতে সদ্য রোপণ করা আমন ধানের চারাগুলো সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, আগামী ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে খেত থেকে পানি নেমে না গেলে সম্পূর্ণ ধান নষ্ট হয়ে যাবে।
স্থানীয়দের আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, হামরাগুলা তিস্তাপাড়োত কষ্ট করি বাঁচি আছি। হামারগুলার কষ্টের শ্যাষ আর নাই। তিস্তাত পানি বাড়লেও হামার কষ্ট আর পানি নামি গ্যাইলেও হামারগুলার কষ্ট। পানি বাড়লে বান হয় আর পানি নামি গ্যালি নদীভাঙন শুরু হয়। হামারগুলার খালি বিপদ আর বিপদ।
একই চিত্র দেখা গেছে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চর নেহালি গ্রামে। সেখানকার কৃষক আকবর আলী জানান, বুধবার রাতে তার বসতঘরে হাঁটুসমান পানি জমে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন তিনি। গত দেড় মাস ধরে তিস্তার পানি এভাবে নিয়মিত ওঠানামা করছে। একটু পানি বাড়লেই বন্যা, আর পানি নামার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় সর্বনাশা ভাঙন। গত এক মাসেই শুধু তার গ্রামে প্রায় ১০০টি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, হামার বাড়িটাও নদীর কাচারোত পড়ি গ্যাইছে। এইবার ভাঙন শুরু হইলে বাস্তুভিটাটা আর বাঁচা যাবার নয়। ১০ শতক বাস্তুভিটার জমিকোনায় মোর শ্যাষ সম্বল।
আরও পড়ুন: লালমনিরহাটে বিচারক সংকটে বাড়ছে মামলাজট, ভোগান্তিতে বিচারপ্রার্থী
এদিকে কালীগঞ্জের শৈলমারী চরের কৃষক হযরত আলী জানান, বুধবারের সর্বগ্রাসী পানিতে তাদের গ্রামের প্রতিটি বাড়ির ভেতর থৈ থৈ করেছে পানি। তলিয়ে গেছে সমস্ত রাস্তাঘাট। তিস্তাত অল্প এ্যাকনা পানি বাড়লে হামারগুলার বাড়ি-ঘরোত পানি ঢুকি যায়। পানি বাড়লে হামার এত্যি( এদিকে) বান হয় আর পানি কমি গ্যাইলে ভাঙন হয়। বান আর ভাঙনোত পড়ি হামরাগুলা প্রতনিয়িত জমি হারবার নাইকছি। হামারগুলার কপালোত সুখ আর নাই, যোগ করেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় লালমনিরহাটের তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১০ মিটার, যা বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে (বিপৎসীমা ৫২.১৫ মিটার)। সকাল ৯টায় ওই পয়েন্টে আরও ২ সেন্টিমিটার পানি কমে যায়। এছাড়া রংপুরের কাউনিয়া ও গাইবান্ধার তারাপুর পয়েন্টেও তিস্তার পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এর আগে গত বুধবার সকালে ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, বুধবার তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে থাকলেও বৃহস্পতিবার সকালে তা কমে বিপৎসীমার নিচে নেমেছে এবং পানি কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে। উজানের পাহাড়ি ঢল না নামলে আপাতত পানি বাড়ার শঙ্কা নেই।
তিনি আরও বলেন, এভাবেই গেল দেড় মাসধরে তিস্তার পানি ওঠানামা করছে। তিস্তাপাড়ে সাধারনত ফ্লাশ ফ্লাড হয়ে থাকে। বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিলে সর্বোচ্চ ২৪ ঘন্টার মধ্যে পানি নেমে যায়।
তবে পানি দ্রুত নেমে গেলেও ভাঙনের তীব্রতা ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে দিন দিন আরও বেশি দুর্বিষহ করে তুলছে। স্থায়ী কোনো সমাধান না পাওয়ায় প্রতি বছরই এই অঞ্চলের মানুষকে নতুন করে লড়াই করতে হচ্ছে প্রকৃতির এই চরম রুদ্ররোষের বিরুদ্ধে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








