অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ৩৫ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মতো অসংক্রামক রোগের ভয়াবহ বিস্তার রোধে ‘হোল-অব-গভর্নমেন্ট’ বা সর্বাত্মক সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
এ লক্ষ্যে গঠিত উচ্চপর্যায়ের ‘অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সমন্বয় কমিটি’র প্রথম সভা সোমবার (২২ জুন) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে আয়োজিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিবরা অংশগ্রহণ করেন। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ।
বর্তমানে বাংলাদেশে মৃত্যুর ৭১ শতাংশেরও বেশি অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটছে, যার মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশই অকালমৃত্যু। এই পরিস্থিতি দেশের জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সভার আলোচনায় উঠে আসে যে, কেবল ওষুধ বা চিকিৎসা দিয়ে এই বিপুল সংখ্যক রোগীর ভার সামলানো সম্ভব নয়; বরং চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা এখন সময়ের দাবি।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে উদ্ভাবনী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে বলেন, নিয়মিত হাঁটাচলা, কায়িক পরিশ্রম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পারলে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিতে উদাহরণ তৈরি করা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনে উৎসাহিত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
আরও পড়ুন: দেশের পাঁচ বিভাগে চালু হচ্ছে ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল
সভার অন্যতম মূল সিদ্ধান্ত হলো ‘হেলথ ইন অল পলিসিজ’ বা ‘সব নীতিতে স্বাস্থ্য’ ধারণার বাস্তবায়ন। এর আওতায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের উন্নয়ন প্রকল্প এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে আবশ্যিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করবে। সমন্বিত এই কার্যক্রমকে গতিশীল করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমের সমন্বয় ও অগ্রগতি প্রতিবেদনের জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ‘ফোকাল পয়েন্ট’ হিসেবে মনোনয়ন দেবে। মনোনীত এই কর্মকর্তাদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত বৈজ্ঞানিক, ব্যয়-সাশ্রয়ী এবং কার্যকর কৌশল বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। পরবর্তী এক থেকে তিন মাসের মধ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজ নিজ খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে, যেখানে কাজের স্বচ্ছতা ও ফলাফল যাচাইয়ের জন্য মনিটরিং কাঠামো ও পরিমাপযোগ্য সূচক অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
গত বছরের ২০ আগস্ট ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অংশগ্রহণে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘যৌথ ঘোষণা’র ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি এই সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়। আজকের এই উচ্চপর্যায়ের সভা সেই উদ্যোগকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ বাংলাদেশের এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের কারিগরি সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। সভায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা নিজ নিজ খাতের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ তুলে ধরেন, যা আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সরকার মনে করছে, রাষ্ট্রীয় সব বিভাগের সমন্বিত এই উদ্যোগ অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় দেশে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং জনগণের গড় আয়ু ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








