বিদ্যুতের পাইকারি দাম পুনর্নির্ধারণের পথে বিইআরসি
ফাইল ছবি
বিদ্যুতের পাইকারি দাম কমানোর একটি জোরালো আভাস পাওয়া গেছে, যা চলতি সপ্তাহেই আনুষ্ঠানিক আদেশের রূপ নিতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই নতুন দাম কার্যকর হতে পারে জুন মাসের বিলিং মাস থেকেই। মূলত আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের খুচরা দাম পুনঃনির্ধারণের ফলে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যে তীব্র আর্থিক চাপের সৃষ্টি হয়েছে, তা কিছুটা লাঘব করতেই বিইআরসি (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) এই পুনর্বিবেচনার পথে হাঁটছে।
সর্বশেষ গত ৩ জুন পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। তবে ঘোষণার পরপরই গ্রাহকস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে লাইফলাইন (৫০ ইউনিট পর্যন্ত) এবং ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। বিইআরসির তথ্যমতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেলেও বিতরণ কোম্পানিগুলোর বার্ষিক রাজস্ব আয়ে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি); তাদের একারই প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব কমার আশঙ্কা রয়েছে।
এই বিশাল ঘাটতি সামাল দিতেই আরইবি আনুষ্ঠানিকভাবে বিইআরসির কাছে পাইকারি দাম পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছে। আরইবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ালেও তা পরবর্তীতে প্রত্যাহার করায় তাদের আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
সংস্থাটির তথ্যানুসারে, শুধুমাত্র এই দুই ধাপে আগের দর বহাল থাকায় তাদের বার্ষিক লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায়। বিশেষ করে আরইবির অধীনস্থ বেশিরভাগ সমিতিই দীর্ঘ সময় ধরে লোকসানে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির নীট লোকসানের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা, যেখানে ৬৪টি সমিতি ৫ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকার বেশি লোকসানের বোঝা টানছে। গত এক দশকে ২০১৮-১৯ ও ২০২০-২১ অর্থবছর ছাড়া প্রায় প্রতি বছরই সমিতিগুলোকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়েছে, যার মধ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছর ছিল সবচেয়ে সংকটময়।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বিতরণ কোম্পানিগুলোর সাথে আলোচনার প্রেক্ষিতেই এই পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যদিও বর্তমানে শুধু আরইবি আবেদন করেছে, তবে পাইকারি দাম কমানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তা সকল বিতরণ কোম্পানির ক্ষেত্রেই কার্যকর করা হবে। তবে এর বিপরীত দিকটিও বেশ চ্যালেঞ্জিং। পাইকারি পর্যায়ে দাম কমানো হলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) রাজস্ব আয় আরও কমে যাবে এবং সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে যাবে। ইতিমধ্যে ১৯.৮৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর পরও বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা পাইকারি দর কমানোর ফলে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী গ্রাহকের সংখ্যার দিক থেকে আরইবির পরেই রয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, নেসকো এবং ওজোপাডিকো। তুলনামূলকভাবে ডেসকো ও ডিপিডিসি এ ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে।
তবে সামগ্রিক এই প্রক্রিয়ায় একটি বিষয় স্পষ্ট পাইকারি দাম কমানো হলেও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দামে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো বিতরণ কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা কিছুটা পুনরুদ্ধার করা এবং পিডিবির ওপর দায়বদ্ধতার ভারসাম্য রক্ষা করা। বর্তমানে বিইআরসি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুরো বিষয়টি যাচাই-বাছাই করছে, যাতে ভোক্তা স্বার্থ ঠিক রেখে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








