বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচার অনিশ্চিত
ছবি: সংগৃহীত
অপেক্ষা আর মাত্র ৩৩ দিনের। এরপরই উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় পর্দা উঠবে ফুটবল বিশ্বের সবচাইতে বড় আসর ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’-এর। মাঠের লড়াই শুরুর ক্ষণ গণনা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন বাংলাদেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে দানা বাঁধছে এক বিশাল সংশয় এবার কি তবে ঘরে বসে প্রিয় দলের খেলা দেখা হবে না? সাধারণত মাসখানেক আগে থেকেই যেখানে উন্মাদনা তুঙ্গে থাকে, সেখানে এবার বিরাজ করছে এক অদ্ভুত নীরবতা। কারণ, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো টেলিভিশন চ্যানেল বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিশ্বকাপের সরাসরি সম্প্রচার স্বত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে বড় পর্দায় মেসি-নেইমারদের কারিকুরি দেখা নিয়ে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন অনিশ্চয়তা।
বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে এই ধোঁয়াশার মূলে রয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক প্রাইভেট লিমিটেড’। এবার বাংলাদেশে বিশ্বকাপের টেলিভিশন, রেডিও এবং ইন্টারনেটসহ যাবতীয় মিডিয়া স্বত্ব পেয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। তবে তারা সম্প্রচার স্বত্বের জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবি করেছে, তা দেশের বর্তমান বাজার ও আর্থিক প্রেক্ষাপটে আকাশচুম্বী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, স্প্রিংবক বিটিভির কাছে শুধু লাইসেন্স ফি বাবদই ১ কোটি ২৩ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৫১ কোটি টাকা দাবি করেছে। এর সঙ্গে ভ্যাট ও ট্যাক্স যুক্ত হলে এই খরচের অঙ্ক ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
চুক্তির শর্তগুলোও বেশ কঠিন। দাবিকৃত অর্থের অর্ধেক আগামী ১০ মে এবং বাকি অর্ধেক ১০ জুনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। ১০৪টি ম্যাচের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য এত অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা জোগাড় করা এবং তা পরিশোধ করা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিটিভি বা বেসরকারি চ্যানেলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণ মানুষের বড় ভরসা সবসময় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) হলেও এবার খোদ সরকারই স্বত্ব কেনার বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি এবং পূর্ববর্তী চুক্তিগুলোর অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, সরকারি কোষাগার থেকে বিশাল অর্থ ব্যয় করে স্বত্ব কেনার আগ্রহ আপাতত সরকারের নেই।
মন্ত্রী সরাসরি উল্লেখ করেছেন যে, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় সরকারি অর্থ ব্যয় করে স্বত্ব কেনা হলেও বিজ্ঞাপন থেকে তার ১০ শতাংশ খরচও উঠে আসেনি।
আরও পড়ুন: নেইমারকে বিশ্বকাপে দেখতে চান মেসি
সরকার এবার আর্থিক সীমাবদ্ধতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে। তবে মন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি যৌথভাবে বা একক উদ্যোগে এগিয়ে আসে, তবে সরকার পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। বিটিভি ইতিমধ্যে ফিফার কাছ থেকে বিনা মূল্যে বা কম মূল্যে ফিড পাওয়ার চেষ্টা করেও এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া পায়নি। কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারত ও চীনের মতো বড় বাজারেও এবার সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
বেসরকারি চ্যানেল যেমন টি স্পোর্টস, জিটিভি কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম টফি (Toffee) গতবার সফলভাবে খেলা দেখালেও এবার তারাও পিছু হটছে। এর প্রধান কারণ ‘টাইম জোন’ বা ম্যাচের সময়সূচি। এবারের ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ৫২টি ম্যাচ বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টার আগে শেষ হবে এবং বাকি ৫২টি শুরু হবে ভোর ৪টার পর। বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত প্রতিকূল।
সম্প্রচার সংশ্লিষ্টদের মতে, শেষ রাতের বা ভোরের খেলায় দর্শক সমাগম তুলনামূলক কম থাকে, যার ফলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বড় অঙ্কের বিজ্ঞাপন দিতে আগ্রহী হয় না। বিজ্ঞাপন থেকে খরচ তোলা সম্ভব না হলে ২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ বড় ধরনের লোকসানের কারণ হতে পারে। বেসরকারি মাধ্যমগুলো সাফ জানিয়ে দিয়েছে, বিটিভি যদি সরকারি ভর্তুকি বা সহায়তায় বড় অংশের খরচ ভাগ না করে, তবে এককভাবে এই ঝুঁকি নেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা সবখানেই এখন একটাই প্রশ্ন, “খেলা দেখা যাবে তো?” আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী এরই মধ্যে অনলাইনে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। বিশ্বকাপ শুরুর ৩৩ দিন বাকি থাকলেও বাংলাদেশে কোনো প্রোমোশনাল কার্যক্রম শুরু না হওয়াকে ফুটবলভক্তরা ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য করছেন।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের সময় দেশজুড়ে যে উৎসবের আমেজ ছিল, সম্প্রচার অনিশ্চয়তার কারণে এবার তাতে ভাটা পড়েছে। যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্প্রিংবক প্রাইভেট লিমিটেডের সাথে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো না যায়, তবে দেশের কোটি কোটি মানুষ হয়তো প্রিয় দলের জার্সি গায়ে দিয়ে টিভির সামনে বসার সুযোগ হারাবেন। ১১ জুন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ শুরুর আগেই এই জট খোলে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








