এক বছরে সব স্থানীয় নির্বাচনের মহাপরিকল্পনা
ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের সফল সমাপ্তির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করার একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এবং আইন ও বিধি সংস্কার কমিটির প্রধান জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পর্যালোচনা করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের একটি বিস্তারিত রূপরেখা পাওয়া গেছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনই বর্তমানে ইসির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আইন, বিধি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, বাজেট বরাদ্দ এবং মৌসুমি বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি কাঠামোবদ্ধ রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তার ভাষায়, এখনো প্রস্তুতি পুরোপুরি শেষ না হলেও এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে সব নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কমিশন এগোচ্ছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোকে কার্যকর, গ্রহণযোগ্য ও তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিদ্যমান আইন ও বিধিমালায় বড় ধরনের সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইন ও বিধি সংশোধন সংস্কার কমিটির প্রধান জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান বিধি এবং সরকারি আইনের পরিবর্তনগুলো নিয়ে একটি তুলনামূলক চিত্র প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও একক মানদণ্ডের বিধিমালা তৈরি করা যায়।
কমিশন মনে করছে, বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিদ্যমান অসংগতি দূর করে একটি অভিন্ন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা গেলে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।
একই সঙ্গে কমিশন জানিয়েছে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামানতের পরিমাণ পুনর্বিবেচনা, প্রচারের ক্ষেত্রে পোস্টার ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং ইভিএম পদ্ধতি বাতিলসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন আনার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নে আগামী তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে বলে কমিশনের সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক প্রস্তুতি, বাজেট প্রক্রিয়া এবং বর্ষা মৌসুমের বাস্তবতাও নির্বাচন আয়োজনের সময়সূচি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: নির্বাচন নিয়ে সেনাপ্রধান: ‘ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন’
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আরও জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের মানদণ্ডের নিচে নামিয়ে আনার কোনো সুযোগ নেই। কমিশন চায়, এই নির্বাচনগুলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হোক এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হোক।
তার মতে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার যে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখতে কমিশন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক দল ও সরকার উভয়ই ভালো নির্বাচন প্রত্যাশা করে, আর কমিশন সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে সব ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করবে। তবে কোন নির্বাচন আগে শুরু হবে সিটি করপোরেশন, উপজেলা বা অন্য কোনো ধাপ সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচন শেষ করার চেষ্টা করা হবে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে সাধারণত স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এসব নির্বাচন সাধারণত ধাপে ধাপে সারা দেশে অনুষ্ঠিত হয়, ফলে একযোগে নয় বরং পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এদিকে নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও একীভূত ও আধুনিক করার লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণেও গুরুত্ব দিচ্ছে ইসি। সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা, চ্যালেঞ্জ এবং ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে ধারাবাহিক কর্মশালা চলছে। এর ধারাবাহিকতায় হাওরাঞ্চল, নগর ও মহানগর এবং কক্সবাজারসহ উপকূলীয় ও পার্বত্য এলাকার মাঠ কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য একটি সমন্বিত সুপারিশ প্রণয়নের কাজ চলছে। কমিশন মনে করছে, ভোটগ্রহণ, গণনা, ফলাফল ঘোষণা, আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় এবং প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনা সব ক্ষেত্রেই অর্জিত অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, এবারের জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে একাধিক নতুন অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে, বিশেষ করে দুই ব্যালট পদ্ধতি এবং পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। ফলাফল ঘোষণা কেন্দ্রীয়ভাবে করতে ১১ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগার অভিজ্ঞতাও কমিশন ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় বিবেচনায় নিচ্ছে।
তার মতে, মাঠ পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত ভোট ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপ আরও সুসংগঠিত করার সুযোগ রয়েছে, যা আগামী নির্বাচনগুলোতে কাজে লাগানো হবে।
একই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন ভবনে আইন ও বিধি সংস্কার সংক্রান্ত বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা পুনর্গঠনের উদ্যোগ আরও এগিয়েছে। বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিধির মধ্যে সামঞ্জস্য আনা, সরকারি আইনের সংশোধনের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং একটি একক কাঠামো তৈরি করাই এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য।
কমিশন জানিয়েছে, নতুন কাঠামোতে নির্বাচন পরিচালনার মানদণ্ড আরও কঠোর ও স্পষ্ট করা হবে, যাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও গ্রহণযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উপযোগী হয়।
সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন এখন একসঙ্গে নীতিগত সংস্কার, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ এই তিনটি ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা চূড়ান্ত করার কাজ চালাচ্ছে। কমিশনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, প্রায় সাড়ে চার হাজার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা একটি বড় কর্মযজ্ঞ হলেও সুপরিকল্পিত কাঠামো ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে তা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








