আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:১২, ১৮ মে ২০২৬

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের নতুন ১৪ দফা

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের নতুন ১৪ দফা

ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং দুপক্ষের মধ্যবর্তী গভীর অচলাবস্থা কাটানোর লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন ও সংশোধিত ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম টানাপোড়েন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সামরিক হুমকির মধ্যেই তেহরান এই পদক্ষেপ নিল। 

মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে এই কূটনৈতিক বার্তাটি ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে তেহরান শান্তি আলোচনার টেবিলে বসার এই পরোক্ষ প্রক্রিয়া চালু রাখলেও যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া আগের মূল শর্তগুলোকে ‘অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক’ বলে সাফ প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে একদিকে যখন পর্দার আড়ালে নতুন খসড়া নিয়ে দেনদরবার চলছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ঘিরে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তেহরান ঘনিষ্ঠ সূত্র এবং তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন ১৪ দফা প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যা পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের কাছে অনুরূপ ১৪ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল বলে দাবি করা হয়, যার জবাবে তেহরান সংশোধিত অবস্থান তুলে ধরে পাল্টা প্রস্তাব তৈরি করে। এই প্রস্তাব বিনিময়ের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা, উত্তেজনা হ্রাস করা এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরির বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। 

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেছেন যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা অব্যাহত রয়েছে, যা দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি নয় বরং পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

একই সময়ে রয়টার্সের বরাতে এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংশোধিত এই প্রস্তাব ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং মতপার্থক্য কমানোর জন্য খুব অল্প সময় অবশিষ্ট রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, উভয় পক্ষই নিয়মিতভাবে নিজেদের শর্ত ও অবস্থান পরিবর্তন করছে, ফলে স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান উত্তেজনা, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও নৌ-অবরোধসংক্রান্ত বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

আরও পড়ুন: আইডাহোর মাঝ আকাশে সংঘর্ষে বিধ্বস্ত দুই মার্কিন যুদ্ধবিমান

অন্যদিকে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া পাঁচ দফা শর্তের আনুষ্ঠানিক জবাবও দিয়েছে, যেখানে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবগুলোকে “অতিরিক্ত” ও “অযৌক্তিক” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ওই প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করে কেবল একটি স্থাপনা চালু রাখা এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা। এর জবাবে ইরান জানায়, তারা দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত সম্পদ ফেরত এবং যুদ্ধজনিত ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। পাশাপাশি তেহরান দাবি করে, পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ নয় বরং সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে পরিচালনার সুযোগ থাকতে হবে।

এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে ইরানকে দ্রুত সমঝোতায় আসার জন্য সতর্ক করেন। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং দাবি না মানলে ইরানের ভবিষ্যৎ গুরুতর পরিণতির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দকৃত সম্পদের একটি অংশ মুক্ত করার বিষয়ে আংশিক নমনীয়তা দেখালেও পূর্ণ সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত চাপ অব্যাহত রাখার অবস্থান বজায় রেখেছে।

আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি প্রস্তাবে, যা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়া প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইরান শর্তসাপেক্ষে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় স্থানান্তর করতে রাজি থাকতে পারে এবং পারমাণবিক কার্যক্রম দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে, যদিও স্থায়ীভাবে তা বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি যেখানে সম্পূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি বিলুপ্ত করার দিকে, সেখানে ইরান নিয়ন্ত্রিত স্থগিতকরণ ও শর্তাধীন সহযোগিতার অবস্থান নিয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে ইরান মূলত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক সুবিধা চায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুদ্ধবিরতির পরও হরমুজ প্রণালি এবং আঞ্চলিক নৌ-অবরোধ ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে, যা কূটনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। পাকিস্তান এই পুরো প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে এবং তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তেহরান সফর ও অবস্থান বাড়ানোকে আলোচনার চলমান গুরুত্বের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফা প্রস্তাব বিনিময়, পাল্টা শর্ত এবং আংশিক সমঝোতার ইঙ্গিত একদিকে যেমন কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ঘিরে মৌলিক মতপার্থক্য এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ফলে পরিস্থিতি আপাতত নাজুক অবস্থায় থাকলেও পরোক্ষ আলোচনার এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে নতুন কোনো সমঝোতার পথ খুলে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়