তাইওয়ান ইস্যুতে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-চীন
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের দুই প্রধান পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কে টানাপোড়েন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আয়োজিত এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাইওয়ান ইস্যুটি বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই বিষয়টি যদি সঠিকভাবে সামলানো না হয় কিংবা কোনো ভুল পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে দুই দেশ কেবল কূটনৈতিক বিরোধেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে। এমনকি পরিস্থিতি সামরিক মুখোমুখি অবস্থানেও গড়াতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
শি জিনপিংয়ের এই কড়া হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এলো যখন ট্রাম্প দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিংয়ে অবস্থান করছেন এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটসহ বৈশ্বিক বাণিজ্য অস্থিরতায় বিশ্ব রাজনীতি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে শি জিনপিং তাইওয়ান ইস্যুকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর” বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভির বরাতে জানা যায়, তিনি ট্রাম্পকে বলেন, তাইওয়ান প্রশ্ন সঠিকভাবে সামাল দেওয়া গেলে দুই দেশের সম্পর্ক সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে, কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত বা উত্তেজনাপূর্ণ পদক্ষেপ দুই দেশকে সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং পুরো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে “অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির” মুখে ফেলতে পারে।
বৈঠকে শি জোর দিয়ে বলেন, তাইওয়ান প্রণালির শান্তি ও স্থিতিশীলতা শুধু পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, এই প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি খাত, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে ব্যাপকভাবে পড়বে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় ভূমিকারের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার গভীর উদ্বেগের মধ্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
আরও পড়ুন: শি জিনপিংকে প্রশংসায় ভাসালেন ট্রাম্প, বেইজিং বৈঠকে বন্ধুত্বের উষ্ণ বার্তা
চীনা প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তি বজায় রাখা এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করা একসঙ্গে সম্ভব নয়।
তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে ‘এক চীন’ নীতির আওতায় স্বশাসিত তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপকে চীন কখনোই মেনে নেবে না। চীনা কর্মকর্তারাও বৈঠকের সময় তাইওয়ান ইস্যুতে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই তাইপের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কিন্তু ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। ওয়াশিংটন নিয়মিতভাবে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়, যা বেইজিংয়ের সঙ্গে উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ। দক্ষিণ চীন সাগরে প্রভাব বিস্তার, বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং সামরিক অবস্থান নিয়ে চলমান বিরোধের পাশাপাশি তাইওয়ান ইস্যু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে বিস্ফোরক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
বৈঠকে ট্রাম্প তুলনামূলক ইতিবাচক সুরে কথা বলেন। চীন সফরের শুরুতে তিনি শি জিনপিংকে “মহান নেতা” এবং “বন্ধু” হিসেবে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে দুই দেশের জন্য “একসঙ্গে অসাধারণ ভবিষ্যৎ” গড়ার আশাবাদও ব্যক্ত করেন।
তবে শি জিনপিং তুলনামূলক সংযত কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করে বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের “প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার হওয়া উচিত” এবং উভয় দেশের যৌথ দায়িত্ব হওয়া উচিত তাইওয়ান প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা প্রতিরোধ করা।
এদিকে শি জিনপিংয়ের এই কঠোর সতর্কবার্তার পর তাইওয়ান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির প্রতি তাদের “স্পষ্ট ও দৃঢ় সমর্থন” পুনর্ব্যক্ত করেছে। যদিও ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘এক চীন’ নীতি স্বীকার করে, তবুও তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা জোরদারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাইওয়ান প্রশ্ন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নয়, বরং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে তাইওয়ানের কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে তাইওয়ান প্রণালিতে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্প, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্য বিরোধ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হলো এই গুরুত্বপূর্ণ ট্রাম্প-শি বৈঠক। মতপার্থক্য ও উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও উভয় পক্ষই শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের আরও অবনতি এড়াতে সংলাপ অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








