বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণে ট্রাম্প-শি শীর্ষ বৈঠক
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের দুই শীর্ষ অর্থনৈতিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে চীনের রাজধানী বেইজিং-এর ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, যা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির টালমাটাল প্রেক্ষাপটে দুই নেতার এই সাক্ষাৎকে শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির এই শীর্ষ বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, তাইওয়ান ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং শুল্কসংক্রান্ত বিরোধের মধ্যে এই বৈঠক ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের অবস্থান এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
স্থানীয় সময় বুধবার (১৩ মে) বেইজিংয়ে পৌঁছান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ২০১৭ সালের পর এটিই তার প্রথম চীন সফর। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান চীনের ভাইস প্রেসিডেন্টসহ দেশটির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা। ট্রাম্পের মোটরকেড বৃহস্পতিবার সকালে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে পৌঁছালে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা জানানো হয়। ঐতিহাসিক এই ভবনটি ১৯৫৯ সালে গণচীন প্রতিষ্ঠার দশম বার্ষিকী উপলক্ষে নির্মিত হয়েছিল এবং এটি তিয়েনআনমেন স্কয়ার-এর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আয়োজনের জন্য চীন নিয়মিত এই স্থাপনাটি ব্যবহার করে।
বৈঠকের শুরুতে ট্রাম্পকে ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়। এরপর বাজানো হয় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত ‘দ্য স্টার-স্প্যাংলড ব্যানার’। একইসঙ্গে লাল ও সোনালি রঙে সজ্জিত মঞ্চে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলেন ট্রাম্প ও শি জিনপিং। পরে বাজানো হয় চীনের জাতীয় সংগীত। আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুই নেতা করমর্দন করেন এবং সামরিক কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন। লাল গালিচাজুড়ে আয়োজিত বর্ণাঢ্য এই অনুষ্ঠানে অংশ নেয় চীনা সামরিক বাহিনী এবং উজ্জ্বল পোশাক পরিহিত কয়েক ডজন শিশু, যারা দুই দেশের পতাকা ও ফুলের তোড়া হাতে ট্রাম্পকে স্বাগত জানায়।
আরও পড়ুন: বেইজিং পৌঁছালেন ট্রাম্প, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে শি জিনপিং বলেন, পুরো বিশ্ব এখন এই আলোচনার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ব বর্তমানে এমন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যা গত এক শতাব্দীতেও দেখা যায়নি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থিতিশীল ও জটিল হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ট্রাম্প ও মার্কিন জনগণকে অভিনন্দন জানান তিনি।
শি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার মাধ্যমে লাভবান হতে পারে, আর সংঘাতের মাধ্যমে উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হওয়া উচিত।
জবাবে ট্রাম্প শি জিনপিংকে “বন্ধু” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তার সঙ্গে সম্পর্ককে তিনি অত্যন্ত সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখেন।
তিনি জানান, চীনা প্রেসিডেন্টের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের নিয়ে এসেছেন। বৈঠক থেকে ইতিবাচক ফল আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ট্রাম্প।
এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় ট্রাম্পের সঙ্গে রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এবং মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার। এছাড়া সফরসঙ্গী হিসেবে বেইজিংয়ে এসেছেন অ্যাপল-এর প্রধান নির্বাহী টিম কুক, টেসলা ও স্পেসএক্স প্রধান ইলন মাস্ক এবং ব্ল্যাকরক প্রধান ল্যারি ফিঙ্কসহ একাধিক মার্কিন করপোরেট নেতা।
বৈঠকের কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে বাণিজ্য ও শুল্কনীতি। দীর্ঘদিন ধরে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তি খাতে নিষেধাজ্ঞা, সেমিকন্ডাক্টর রফতানি নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাসের মতো ইস্যুগুলো এবার আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটন বাণিজ্যে নতুন সমঝোতার চেষ্টা করবে, অন্যদিকে বেইজিং মার্কিন বাজারে সেমিকন্ডাক্টর রফতানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিলের দাবি তুলতে পারে।
তাইওয়ান প্রশ্নও বৈঠকের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ রয়েছে। একইসঙ্গে প্রযুক্তিগত আধিপত্য নিয়ে প্রতিযোগিতা, বিশেষত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিপ প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে প্রভাব বিস্তার নিয়েও উভয় পক্ষের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিও এই বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন চীনের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চীনের বিপুল তেল ও গ্যাস আমদানির ফলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে এবং তা আঞ্চলিক সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছে।
ট্রাম্প চাইছেন, বেইজিং তার প্রভাব ব্যবহার করে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে ভূমিকা রাখুক। যদিও চীন ঐতিহ্যগতভাবে অন্য দেশের সংঘাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ থেকে দূরে থাকার নীতি অনুসরণ করে, তবুও এবার বিষয়টি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের এই সফরকে কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বৈঠক শেষে দুই নেতার বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় ভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বৈঠকের ফলাফল শুধু ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার, প্রযুক্তি খাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








