আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:৩৬, ১০ মে ২০২৬

‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে চরম মূল্য দিতে হবে বিশ্বকে’

‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে চরম মূল্য দিতে হবে বিশ্বকে’

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা উত্তেজনা ও সম্ভাব্য সংঘাত নিরসনে সরব হয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। 

তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই সংঘাত ‘যত দ্রুত সম্ভব’ শেষ হওয়া প্রয়োজন; অন্যথায় এর ভয়াবহ পরিণতি এবং গুরুতর প্রভাব পুরো বিশ্বকে দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করতে হবে। 

মস্কোতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুতিন চলমান সংকটের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে একটি কূটনৈতিক সমাধানের রূপরেখা তুলে ধরেন। 

তিনি স্পষ্ট জানান, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার চরম অবনতির কারণে ‘সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে’।

প্রেসিডেন্ট পুতিন তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতার বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও দাম নিয়ে ইতোমধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পুতিনের মতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর চাপ তত বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। এই সংকট মোকাবিলায় মস্কো এখনো কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রেখেছে এবং তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষের সাথেই নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।

সংকট নিরসনে রাশিয়ার পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর প্রস্তাব দিয়েছেন পুতিন। তিনি জানান, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান মজুত রাশিয়ায় স্থানান্তর ও সেখানে নিরাপদ সংরক্ষণের বিষয়ে মস্কো সম্পূর্ণ প্রস্তুত। রাশিয়ার এই প্রস্তাব নতুন কিছু নয়; পুতিন স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির (JCPOA) সময়ও রাশিয়া ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিয়েছিল। 

আরও পড়ুন: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেন ট্রাম্প

তিনি বলেন, প্রয়োজনে আমরা সেই অভিজ্ঞতা আবারও কাজে লাগাতে প্রস্তুত। 

পুতিনের ভাষ্যমতে, এক সময় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই ইরানের বাইরে ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের বিষয়ে একমত হয়েছিল, যা পরমাণু অস্ত্র তৈরির আশঙ্কা কমিয়ে আনার একটি বড় পদক্ষেপ ছিল।

চলমান অচলাবস্থার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনকে দায়ী করে রুশ প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, শুরুতে ইউরেনিয়াম স্থানান্তরের বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও পরবর্তীতে ওয়াশিংটন তাদের অবস্থান কঠোর করে। যুক্তরাষ্ট্র শর্ত দেয় যে, ইরানের ইউরেনিয়াম কেবল মার্কিন ভূখণ্ডেই স্থানান্তর করতে হবে। ওয়াশিংটনের এমন একপেশে অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় ইরানও তাদের নীতিতে কঠোরতা আনে, যার ফলে আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ে। 

পুতিন আশা প্রকাশ করেন যে, পক্ষগুলো পুনরায় নমনীয় হবে এবং একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছাবে।

দীর্ঘদিন ধরেই ইরান দাবি করে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং কেবল বেসামরিক প্রয়োজনে (বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা) পরিচালিত হচ্ছে। তবে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের শঙ্কা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ভবিষ্যতে তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা এনে দিতে পারে। তেহরান অবশ্য বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) নজরদারির কথা উল্লেখ করে আসছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই উদ্যোগের পেছনে বহুমুখী কৌশল কাজ করছে। একদিকে মস্কো মধ্যপ্রাচ্যে নিজের কূটনৈতিক আধিপত্য ও প্রভাব বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করতে চাইছে। এছাড়া জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা রাশিয়ার নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্যও জরুরি। পুতিনের এই প্রস্তাব যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়ানোর ক্ষেত্রে একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়