নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:০৫, ১২ মে ২০২৬
আপডেট: ১৬:০৫, ১২ মে ২০২৬

চট্টগ্রামে মস্তিষ্কখেকো জাপানি ভাইরাস এনকেফালাইটিসের হানা, মৃত্যু ১

চট্টগ্রামে মস্তিষ্কখেকো জাপানি ভাইরাস এনকেফালাইটিসের হানা, মৃত্যু ১

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

চট্টগ্রামে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে মশাবাহিত বিরল ভাইরাসজনিত রোগ ‘জাপানিজ এনকেফালাইটিস’। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) তরুণ অধ্যাপক ড. জাকিয়া সুলতানা জুথির মৃত্যুর পর এই রোগ নিয়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। 

চিকিৎসকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই দেশে বিচ্ছিন্নভাবে এই ভাইরাস থাকতে পারে, কিন্তু যথাযথ পরীক্ষা ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ ঘটনাই আড়ালে থেকে গেছে। এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের গবেষণা, কয়েকজন রোগীর শনাক্তকরণ এবং সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

৩৬ বছর বয়সী ড. জাকিয়া সুলতানা জুথি সিভাসুর ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফ্যাকাল্টির ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। গত ৭ মে ভোরে চট্টগ্রামের এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরিবার ও সহকর্মী সূত্র জানায়, মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি বান্দরবান ভ্রমণে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পর হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হন। প্রথমদিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর বা ম্যালেরিয়া সন্দেহ করা হলেও দ্রুত তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।

গত শনিবার রাতে প্রথম জ্বর আসে তার। পরদিন জ্বরের সঙ্গে বমি ও ডায়রিয়ার উপসর্গ দেখা দেয়। মধ্যরাতে তিনি নিজেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান, তবে সেখানে শয্যা না পেয়ে পরে মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ভর্তি হন। সোমবার ভোরে শুরু হয় তীব্র খিঁচুনি। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং দ্রুত তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা শুরুতে ম্যালেরিয়া সন্দেহে পরীক্ষা করলেও রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। পরে এমআরআই রিপোর্টে মস্তিষ্কে মারাত্মক সংক্রমণ ও ক্ষতির চিহ্ন ধরা পড়ে। বিশেষজ্ঞরা তখন ‘জাপানিজ এনকেফালাইটিস’ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানান।

মেট্রোপলিটন হাসপাতালের আইসিইউ বিশেষজ্ঞ ডা. কাওসারুল আলম জানিয়েছেন, রোগীর জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি মস্তিষ্কে দ্রুত পরিবর্তনের লক্ষণ ছিল। তিনি বলেন, ব্রেইন স্ট্রোকের মতো উপসর্গ ও স্নায়বিক জটিলতা ভাইরাসজনিত এনকেফালাইটিসের দিকেই ইঙ্গিত করছিল। পরে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলেও সেখানে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে রাখা অবস্থায় তিনি কোমায় চলে যান। টানা তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই শেষে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে বলা হয়নি যে তিনি জাপানিজ এনকেফালাইটিসে আক্রান্ত ছিলেন কি না। কারণ, এই ভাইরাস শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় আরটিপিসিআর পরীক্ষা চট্টগ্রামের সরকারি বা বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই নিয়মিতভাবে চালু নেই। 

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, রোগীর বান্দরবান ভ্রমণের ইতিহাস থাকায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোর কাছে পরীক্ষার রিপোর্টও চাওয়া হয়েছে। 

তার ভাষায়, পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানিজ এনকেফালাইটিস মূলত কিউলেক্স প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই মশা সাধারণত শূকর ও বুনো পাখি থেকে ভাইরাস বহন করে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটায়। তবে মানুষ থেকে মানুষে এই রোগ ছড়ায় না। ভাইরাসটি মানবদেহে প্রবেশের পর সরাসরি স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কে আক্রমণ করতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে রোগী দ্রুত অচেতন হয়ে যেতে পারেন, খিঁচুনি হতে পারে, এমনকি কোমায়ও চলে যেতে পারেন।

চিকিৎসকদের মতে, রোগটির প্রাথমিক উপসর্গ অনেকটা সাধারণ জ্বরের মতো হওয়ায় এটি সহজে শনাক্ত করা যায় না। শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, দুর্বলতা কিংবা সর্দির মতো লক্ষণ দেখা দিলেও পরে খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, পক্ষাঘাত বা আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি হলেও প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন।

আরও পড়ুন: হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে ১৪৫৯

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোমেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. হাসানুজ্জামান বলেন, শরীরে অস্বাভাবিক দুর্বলতা, আচরণগত পরিবর্তন বা খিঁচুনির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিউরোলজি বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। কারণ, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়।

এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছয় মাসব্যাপী এক গবেষণায় ৭৫ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে তিনজনের শরীরে এনকেফালাইটিস ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষক ও চিকিৎসক ডা. আসিফুল হক। 

তিনি বলেন, একজন রোগীর এমআরআই দেখে জাপানিজ এনকেফালাইটিস সন্দেহ করা হয়। পরে কয়েকজন রোগীকে উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা দিয়ে সুস্থও করা গেছে। তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত করা না গেলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি)-এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ বলেছেন, দেশে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার পরীক্ষার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও জাপানিজ এনকেফালাইটিসের আরটিপিসিআর পরীক্ষাটি এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। 

তার মতে, অতীতে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও পরীক্ষার অভাবে সেগুলো শনাক্ত হয়নি।

তবে বাস্তবতা হলো, চট্টগ্রামে এখনো এই ভাইরাস নির্ণয়ের পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। বিআইটিআইডি ল্যাবের ইনচার্জ ডা. জাকির হোসেন জানিয়েছেন, তাদের ল্যাবে পিসিআর মেশিন থাকলেও জাপানিজ এনকেফালাইটিস শনাক্তের পরীক্ষা চালু হয়নি। একই তথ্য দিয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ল্যাব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও। বেসরকারি খাতেও পরীক্ষাটি এখনো চালু হয়নি। 

শেভরণ ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরির মহাব্যবস্থাপক পুলক পাড়িয়াল বলেছেন, এটি নতুন ধরনের পরীক্ষা হওয়ায় এখনো তাদের ল্যাবে শুরু হয়নি, তবে ভবিষ্যতে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্বের উন্নত অনেক দেশে জাপানিজ এনকেফালাইটিস প্রতিরোধে টিকা ব্যবহার করা হলেও বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের টিকা সাধারণ মানুষের জন্য চালু হয়নি। চিকিৎসকরা বলছেন, রোগটির কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসাও নেই। কেবল উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা দূর করা, শূকর ও বুনো প্রাণীর সংস্পর্শে সতর্কতা, এবং জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি বা অচেতনতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী ও পাহাড়ি অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো, পরীক্ষার কিট সরবরাহ এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে আরটিপিসিআর সুবিধা চালুরও দাবি উঠেছে।

ড. জাকিয়া সুলতানা জুথির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্যও একটি সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করা এই শিক্ষক ছিলেন সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তার স্বামী ড. শাহরিয়ার হাসেম অর্ণবও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পাঁচ বছর বয়সী এক সন্তান রেখে তার অকাল মৃত্যুতে শিক্ষা ও গবেষণা অঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়