পরিতোষ লিমন, সাংবাদিক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:৩৩, ১০ মে ২০২৬

বিশ্ব মা দিবস: অকৃত্রিম মমতা ও আত্মত্যাগের জয়গান

বিশ্ব মা দিবস: অকৃত্রিম মমতা ও আত্মত্যাগের জয়গান

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

‘যেখানেতে দেখি যাহা, মা-এর মতন আহা/ মার বড় কেউ নাই, কেউ নাই কেউ নাই!’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই অমোঘ সত্যটিই যেন পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ের কথা। মা, এক অক্ষরের ছোট একটি শব্দ, অথচ এর গভীরতা ও বিশালতা আকাশসমান। জন্মের আগে থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি বাঁকে যে মানুষটি নিঃস্বার্থ বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে আগলে রাখেন, তিনি মা। সন্তানের হাসি যার পৃথিবী রাঙিয়ে দেয় আর সন্তানের সামান্য কষ্টে যার চোখ ভিজে ওঠে, সেই মমতাময়ী মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর বিশেষ দিন ‘বিশ্ব মা দিবস’ আজ। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে এই দিবসটি পালিত হয়।

মানুষের জীবনে প্রথম পরিচয় হয় মায়ের সঙ্গে। পৃথিবীর আলো দেখার পর শিশুর প্রথম আশ্রয়, প্রথম নিরাপত্তা, প্রথম ভাষা এবং প্রথম শিক্ষা আসে মায়ের কাছ থেকেই। হাঁটা শেখা, কথা বলা, ভালো-মন্দ বোঝা, মানবিকতা শেখা জীবনের প্রতিটি ভিত্তি গড়ে ওঠে মায়ের হাত ধরেই। এজন্যই বলা হয়, একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে একজন মায়ের।

মায়ের ভালোবাসা পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা হিসেবে বিবেচিত। সন্তানের ভুল, ব্যর্থতা কিংবা দুর্বলতার মাঝেও মা তাকে আগলে রাখেন। পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও মায়ের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। সন্তানের একটি ছোট্ট হাসি, একটি ফোন কল কিংবা সামান্য খোঁজখবরেই যে মানুষটি আনন্দে ভরে ওঠেন, তিনি মা। তাই মা দিবস আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয় মায়ের প্রতি দায়িত্ব শুধু অর্থনৈতিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রয়োজন সময় দেওয়া, অনুভূতির মূল্য দেওয়া এবং সম্মান প্রদর্শন করা।

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে পারিবারিক সম্পর্কের আবেগ ও আন্তরিকতার জায়গা অনেক ক্ষেত্রেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। কর্মব্যস্ততা, দূরত্ব কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের চাপে অনেক সন্তান মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে না। কেউ বিদেশে, কেউ শহরের ব্যস্ততায়, আবার কেউ একই ছাদের নিচে থেকেও মায়ের খোঁজ নিতে ভুলে যায়। অথচ একজন মা সারাজীবন সন্তানের জন্য নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা ও আরাম বিসর্জন দিয়ে যান। বিশেষ করে বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অসংখ্য মা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে নিরলস সংগ্রাম করেন। নিজের প্রয়োজন উপেক্ষা করে সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেন। তাদের এই আত্মত্যাগ নিঃসন্দেহে অনন্য।

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাম কিংবা শহর সব জায়গাতেই একজন মা পরিবারকে আগলে রাখার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করেন। সংসারের হাজারো দায়িত্ব পালন করেও সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে তারা নিরন্তর চেষ্টা করেন। সন্তানের অসুস্থতায় নির্ঘুম রাত কাটানো, নিজের কষ্ট গোপন রেখে পরিবারের সবার যত্ন নেওয়া কিংবা অভাবের সংসারে সন্তানকে স্বপ্ন দেখানোর মতো অসংখ্য ত্যাগ নীরবে বহন করেন মায়েরা।

তবে সমাজের বাস্তবতায় উদ্বেগের জায়গাও রয়েছে। দেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, যা পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যেসব মা একসময় সন্তানকে বুকে আগলে বড় করেছেন, জীবনের শেষ সময়ে তাদের অনেকেই অবহেলার শিকার হচ্ছেন। মা দিবস সেই মানবিক সংকটের দিকটিও সামনে নিয়ে আসে। কারণ একজন মা বিলাসিতা চান না; তিনি চান সন্তানের ভালোবাসা, সম্মান ও সামান্য আন্তরিকতা।

আরও পড়ুন: লোকজ খাদ্য থেকে বিশ্বস্বীকৃত পুষ্টির উৎস ‘পান্তাভাত

বিশ্ব মা দিবসের ইতিহাসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিক মা দিবসের সূচনা যুক্তরাষ্ট্রে। 

ইতিহাসবিদদের মতে, এর পেছনে বিভিন্ন সময় নানা সামাজিক ও মানবিক আন্দোলনের প্রভাব ছিল। প্রাচীন গ্রিসে মাতৃরূপী দেবী সিবেলের আরাধনা এবং প্রাচীন রোমে দেবী জুনোকে কেন্দ্র করে মাতৃত্ব উদযাপনের প্রচলন ছিল। পরে ইউরোপ ও ইংল্যান্ডে ‘মাদারিং সানডে’ নামে মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর রীতি চালু হয়।

আধুনিক মা দিবস প্রতিষ্ঠার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজকর্মী আনা রিভস জার্ভিস এবং তার মেয়ে আনা মেরি জার্ভিস। আনা রিভস জার্ভিস শিশু মৃত্যুহার কমানো ও মায়েদের স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে কাজ করতেন। তিনি ‘মাদারস ডে ওয়ার্ক ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মায়ের সমাজসেবামূলক কাজ ও মাতৃত্বের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে তার মেয়ে আনা মেরি জার্ভিস উদ্যোগ নেন।

১৯০৫ সালের ৫ মে আনা রিভস জার্ভিস মারা যাওয়ার পর তার স্মরণে আনা জার্ভিস মা দিবস পালনের প্রচারণা শুরু করেন। ১৯০৮ সালের ১০ মে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার অ্যান্ড্রুজ মেথডিস্ট এপিসকোপাল চার্চে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালিত হয়। পরে তার নিরন্তর প্রচেষ্টার ফলে ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মাদার্স ডে’ বা মা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেন। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই দিনটি পালন করা হয়।

মা দিবসকে ঘিরে দেশে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক নানা আয়োজন দেখা যায়। কেউ মাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান, কেউ উপহার দেন, আবার অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। তবে অনেকেই মনে করেন, মা দিবস শুধু ফুল, উপহার কিংবা ছবি পোস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রকৃত সম্মান হলো মায়ের অনুভূতি বোঝা, তার পাশে থাকা এবং প্রতিদিনের আচরণে ভালোবাসা প্রকাশ করা।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। ইসলামে মায়ের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। 
মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।’ এই বাণীই মায়ের মর্যাদার গভীরতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। শুধু ইসলাম নয়, বিশ্বের প্রায় সব ধর্ম ও সংস্কৃতিতেই মাকে ভালোবাসা, মমতা ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

সাহিত্য, সংগীত, কবিতা ও চলচ্চিত্রেও যুগে যুগে মায়ের ভালোবাসা বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। 

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় লিখেছিলেন, “যেখানেতে দেখি যাহা, মা-এর মতন আহা, মার বড়ো কেউ নাই।” 

একইভাবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু সাহিত্যিক তাদের সৃষ্টিতে মায়ের অসীম মমতার কথা তুলে ধরেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের তরুণ প্রজন্মের উচিত ব্যস্ততার মাঝেও মায়ের প্রতি আরও যত্নবান হওয়া। প্রতিদিন কিছু সময় মায়ের সঙ্গে কথা বলা, তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া কিংবা ছোট ছোট কাজে সহযোগিতা করাও সম্পর্ককে গভীর করে তোলে। কারণ সময় চলে গেলে অনেক কিছু ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু মায়ের ভালোবাসার বিকল্প কখনো পাওয়া যায় না।

বিশ্ব মা দিবস তাই শুধু উদযাপনের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনারও উপলক্ষ। আমরা কি সত্যিই মায়ের ত্যাগের মূল্য দিচ্ছি? আমরা কি তার অনুভূতি বুঝতে পারছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই হতে পারে দিনটির সবচেয়ে বড় তাৎপর্য। কারণ একজন মা সন্তানের কাছে কোনো বিলাসিতা চান না তিনি চান সামান্য ভালোবাসা, সম্মান এবং আন্তরিকতা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়