কক্সবাজার সংবাদদাতা || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:৩০, ১২ মে ২০২৬

বদলি ঠেকিয়ে বহাল ইনানী রেঞ্জার, বন লুটের অভিযোগ

বদলি ঠেকিয়ে বহাল ইনানী রেঞ্জার, বন লুটের অভিযোগ

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের অতি গুরুত্বপূর্ণ ইনানী রেঞ্জ এখন যেন এক অনিয়মের অভয়ারণ্য। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বদলির আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে একই চেয়ারে জেঁকে বসে আছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা (রেঞ্জার) ফিরোজ আল আমিন। 

অভিযোগ উঠেছে, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এবং এসিএফ-এর বিশেষ ‘আশীর্বাদ’ ও যোগসাজশে তিনি এই রেঞ্জকে নিজের ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন। বদলি আদেশ কার্যকর না করে বহাল তবিয়তে থেকে একদিকে যেমন বনভূমি উজাড় করছেন, অন্যদিকে সরকারের সুফল ও দাতা সংস্থার কোটি কোটি টাকার প্রকল্পে নয়ছয় করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী, বন সংশ্লিষ্ট মহল ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ও সহকারী বন সংরক্ষকের (এসিএফ) বিশেষ আশীর্বাদে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে একই রেঞ্জে অবস্থান করে প্রভাব বিস্তার করছেন এবং বনভূমিকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে নানা অনিয়ম পরিচালনা করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় মাস আগে ফিরোজ আল আমিনের বদলি আদেশ জারি হলেও তা কার্যকর হয়নি। বরং তদবির ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি এখনো ইনানী রেঞ্জের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

স্থানীয়দের দাবি, ইনানী রেঞ্জকে ‘লোভনীয় রেঞ্জ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এই রেঞ্জের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেই নানা কৌশলে বদলি ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। বন বিভাগের অভ্যন্তরেও তাকে ‘ডিএফও’র সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিত বলা হচ্ছে। এ কারণে অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও তার প্রতি বিশেষ আনুগত্য ও বাড়তি খাতির প্রদর্শনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ইনানী রেঞ্জের আওতাধীন রাজাপালং, জালিয়াপালং ও ছোয়ানখালী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবাধে বনভূমি দখল, পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি, ঝাউগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিধন, করাতকল পরিচালনা, বালু ও মাটি উত্তোলন এবং বনভূমিতে নতুন স্থাপনা নির্মাণ চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। বরং এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বন বিভাগের অসাধু একটি অংশের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। 

স্থানীয়দের ভাষ্য, বনভূমি দখল ও অবৈধ বাণিজ্য এখন এতটাই প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে যে বিষয়টি ‘ওপেন সিক্রেট’-এ পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জে বাসায় বিস্ফোরণ, একই পরিবারের দগ্ধ ৪

অভিযোগ রয়েছে, রেঞ্জ কর্মকর্তা ফিরোজ আল আমিন নিয়মিত রাতের টহলের নামে পাহাড় কাটার কাজে ব্যবহৃত মাটি বোঝাই ট্রাক ও অবৈধ কাঠ বহনকারী যানবাহন আটক করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করেন। পরে ঘুষের বিনিময়ে সেসব যানবাহন ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এছাড়া বনভূমি থেকে কাঠ পাচার, ফার্নিচার পরিবহন ও দখলকৃত জমিতে নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক প্রশ্রয়ের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, সামাজিক বনায়ন, সুফল প্রকল্প এবং দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত ‘হেল্প’ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন বাগান সৃজন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমেও ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। 

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের নামে কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। অনেক স্থানে বনায়নের কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে বলে দাবি উঠেছে। 

বন বিভাগের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, এসব অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে বনভূমি রক্ষায় বন বিভাগের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে পরিবেশবাদী মহলে। 

তাদের মতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। পাহাড় কাটা ও বনভূমি দখলের কারণে জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইনানী ও ছোয়ানখালী এলাকায় বনভূমি দখল করে বহুতল ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ থাকলেও উচ্ছেদ অভিযানে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। মামলা থাকলেও নির্মাণকাজ বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

অভিযোগের আরও গভীরে গিয়ে স্থানীয়রা দাবি করছেন, বনভূমি দখল ও অবৈধ আয়ের একটি অংশ ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও পৌঁছায়। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ফিরোজ আল আমিনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অভিযোগগুলোর বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়