বাজেটে আসছে মোবাইল গ্রাহকদের জন্য বড় সুখবর
ফাইল ছবি
দেশের সাড়ে ১৮ কোটির বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী এবং ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেট গ্রাহকদের জন্য আসন্ন অর্থ বছরের বাজেটে বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা আসতে যাচ্ছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও অপারেটরদের দাবির প্রেক্ষাপটে মোবাইল সেবার ওপর আরোপিত ১ শতাংশ সারচার্জ বাতিলের পাশাপাশি বিদ্যমান সিম কর কমানোর চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে গত ১৫ বছরে প্রথমবারের মতো মোবাইল কলরেট, ইন্টারনেট ব্যবহার ব্যয় এবং নতুন সিম কেনার খরচ সব ক্ষেত্রেই সাধারণ গ্রাহক কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে টেলিকম খাতে প্রায় দেড় দশক ধরে চলা উচ্চ করনীতিতে আংশিক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত মিলেছে।
পদ্মা সেতু নির্মাণের অর্থ জোগাতে ২০১৬ সালের মার্চে মোবাইল সেবার ওপর এক শতাংশ সারচার্জ আরোপ করে সরকার। সে সময় বিশ্বব্যাংক প্রকল্প থেকে সরে গেলে নিজস্ব অর্থায়নে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্র। সেই ব্যয়ের অংশ হিসেবে মোবাইল গ্রাহকদের প্রতিটি রিচার্জের ওপর এই অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালু হলেও সারচার্জ বহাল থাকে। বর্তমানে দেশে সাড়ে ১৮ কোটির বেশি মোবাইল সংযোগ ব্যবহারকারী প্রতি ১০০ টাকা রিচার্জে এক টাকা করে এই সারচার্জ দিচ্ছেন।
টেলিকম খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোবাইল সেবায় বর্তমানে করের চাপ অত্যন্ত বেশি। একদিকে ২৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, অন্যদিকে কার্যকর ভ্যাটসহ বিভিন্ন স্তরের কর যুক্ত হওয়ায় ১০০ টাকা রিচার্জে একজন গ্রাহক প্রকৃতপক্ষে প্রায় ৫৮ টাকার সেবা পান। এর বাইরে নতুন সিম কেনা বা পুরোনো সিম রিপ্লেসমেন্টের ক্ষেত্রেও ৩০০ টাকা কর দিতে হয়। ফলে ভয়েস কল ও মোবাইল ইন্টারনেটের খরচ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে কমানো সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি অপারেটরদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আসন্ন বাজেটে এই এক শতাংশ সারচার্জ বাতিলের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ৩০০ টাকার সিম করও কমানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
মোবাইল অপারেটরদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে গত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো টেলিযোগাযোগ খাতে করের চাপ কমবে।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে মোবাইল অপারেটররা সরকারকে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েছে, যার মধ্যে শুধু সারচার্জ থেকেই আদায় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন: একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পেলো পদ্মা ব্যারেজ
টেলিকম খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, করের উচ্চহার বিনিয়োগ ও সেবার সম্প্রসারণ দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে। চলতি বছরেই বেসরকারি তিন মোবাইল অপারেটরকে প্রায় ১৬ হাজার ৮৫১ কোটি টাকার তরঙ্গ নবায়ন করতে হবে। এর ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট হিসেবে প্রায় ১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে।
অপারেটরদের অভিযোগ, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে তরঙ্গ বা স্পেকট্রামের ওপর এ ধরনের ভ্যাট আরোপ করা হয় না। তাদের মতে, অতিরিক্ত কর অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে টেলিকম অবকাঠামোতে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে।
এ বিষয়ে মোবাইল অপারেটরদের পক্ষ থেকে কর কমানোর জোর দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে সিম ট্যাক্স কমানো, সারচার্জ প্রত্যাহার এবং তরঙ্গ নবায়নে ভ্যাট পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তারা মনে করছেন, কর কাঠামো যৌক্তিক করা গেলে গ্রাহক পর্যায়ে সেবার মূল্যও কমানো সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, শুধু মোবাইল অপারেটর নয় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতারাও করছাড়ের দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি ব্রডব্যান্ড গ্রাহক সেবার ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট দিচ্ছেন। ইন্টারনেট সেবাকে আরও সাশ্রয়ী করতে এই ভ্যাট শূন্যে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে ইন্টারনেট সেবাদাতা সংগঠনগুলো। একই সঙ্গে রাউটার, নেটওয়ার্কিং ডিভাইস ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিপণ্য আমদানিতে কর হার কমানোরও দাবি জানানো হয়েছে।
তাদের মতে, এসব কর কমানো গেলে প্রান্তিক এলাকাগুলোতে আরও কম খরচে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও টেলিকম খাতে করের ভার কমানোর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ সম্প্রতি বলেন, ভোক্তাদের কাছ থেকে ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত ট্যাক্স নেওয়া হলেও অনেক খাত বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে করহার অনেক কম। এই বৈষম্যমূলক কাঠামো পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টেলিকম খাতে কর কাঠামোকে আরও যৌক্তিক করতে কাজ চলছে, যাতে গ্রাহক ও সেবাদাতা উভয় পক্ষই উপকৃত হয়।
বর্তমানে দেশে চারটি মোবাইল অপারেটর সেবা দিচ্ছে এবং আড়াই হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পরিচালনা করছে। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা ও ডিজিটাল সেবা সাধারণ মানুষের নাগালে আনতে টেলিকম খাতে কর পুনর্বিন্যাস এখন বড় আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আসন্ন বাজেটে সরকার যদি সারচার্জ প্রত্যাহার, সিম কর কমানো এবং ব্রডব্যান্ড ভ্যাট পুনর্বিবেচনার মতো পদক্ষেপ নেয়, তবে তা দেশের কোটি কোটি মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর জন্য বড় স্বস্তির বার্তা হয়ে আসতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








