artk
৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শনিবার ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৮:৫৪ অপরাহ্ন

শিরোনাম

রিকশাচালক জালালের অন্যরকম স্বপ্ন

রাকিবুল ইসলাম রাকিব, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১০৪০ ঘণ্টা, শনিবার ২০ অক্টোবর ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৩১১ ঘণ্টা, শনিবার ২০ অক্টোবর ২০১৮


রিকশাচালক জালালের অন্যরকম স্বপ্ন - ফিচার
ছবি: প্রতিনিধি

তখন আমি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। বয়স বড়জোড় দশ কিংবা এগারো। বৃদ্ধ বাবা বিছানায় পড়ে গেলেন। পেটের দায়ে কাজ নিলাম প্রতিবেশী জবর আলীর বাড়িতে। থাকা-খাওয়াসহ মাসে বেতন ২৫০ টাকা। সারাদিন কাজ শেষে রাতের বেলা বই নিয়ে বসতাম। কিন্তু জবর আলী বলতো, ‘আমার বাড়িত থাকলে কাম কইর‌্যা খাইতে হইবো, তুই লেহাপড়া করতে পারবি না।’ কিন্তু আমি রাতে লুকিয়ে পড়তাম। এক রাতে বিষয়টি টের পেয়ে জবর আলী আমার বই-খাতা ছিড়ে ফেলে দেয়। তাড়িয়ে দেয় বাড়ি থেকে। তখন রিকশা চালানো শুরু করি। আয়ের টাকায় চলতে থাকে সংসার ও পড়াশোনা। এভাবে কেটে যায় দশ বছর। নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে প্রাথমিক, মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে আমি এখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছি। কিন্তু জীবিকার তাগিদে এখনো আমি রিকশাচালক। এই কথাগুলো মাদরাসা শিক্ষার্থী মো. শাহ জালালের (২০)।

শাহ জালালের বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুরের বোকাইনগর গ্রামে। ওই গ্রামের কিল্লা বোকাইনগর ফাজিল মাদরাসার উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র তিনি। তার বাবার নাম-তারা মিয়া (৭০)। মা আল্পনা বেগম গৃহিনী (৫০)। চার ভাই তিন বোনের মধ্যে জালাল তৃতীয়।

শুক্রবার রাতে জালালের সাথে দেখা মিলে শহরের বঙ্গবন্ধু চত্বরে। ল্যামপোস্টের বাতির নিচে রিকশায় বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলে বই রেখে তিনি বলে উঠেন, কোথায় যাবেন ভাই? উঠেন রিকশায়।

সাংবাদিক পরিচয় দিলে ভুল ভাঙে তার। এ প্রতিনিধিকে তিনি বলেন, সামনে আলিম পরীক্ষা। তাই ভাড়ার ফাঁকে ফাঁকে একটু পড়াশোনা করি। এতটুকু কথা বলেই বইয়ে মনোযোগ দেন তিনি। কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ চলে গেলে পড়াশোনায় ছন্দপতন ঘটে। আলোর অপেক্ষায় থেকে থেকে অন্ধকারেই বসে জীবনের গল্প জুড়ে দেন জালাল।

তিনি জানান, দিনমজুর বাবা রোগাক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে যাওয়ায় চার ভাই রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতাম। তবে গত পাঁচ বছরের মধ্যে দুই ভাই হালিম, আলআমিন ও বোন তানিয়া বিয়ের পর আলাদা হয়ে যায়। এর পর থেকে বাবা-মা ও চার ভাই-বোন একসাথেই আছি। ছোট বোন সোনিয়া সপ্তম ও মুক্তামনি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। তবে অভাবের কারণে ছোট ভাই জয়নালও পড়াশোনা বাদ দিয়ে রিকশা চালানো শুরু করেছে।

এক সময় প্যাডেল চালিত রিকশা চালালেও কয়েক মাস আগে ঋণ নিয়ে ব্যাটারি চালিত নতুন রিকশা কিনেছেন জালাল। প্রতিদিন তার আয় হয় পাঁচশ থেকে ছয়শ টাকা। এই টাকায় চলে সংসার, বাবার চিকিৎসা ও নিজেদের পড়াশোনার খরচ।
এদিকে রিকশা চালান বলে মাদরাসার কিছু সহপাঠী জালালকে কটূক্তি করে। তার সাথে এক বেঞ্চে বসতে চায় না। এসব বিষয় নিয়ে জালাল কষ্ট পায়, তবে কোনো অভিযোগ নেই। তার যত অভিযোগ তার সবটাই জবিরের দিকে। দশ বছর আগে জবির তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে তিন মাসের বেতন ৭৫০ টাকাও আটকে দেয়। জীবনের প্রথম উর্পাজিত ওই টাকার মায়াটা দশ বছরেও ছাড়তে পারেনি জালাল। টাকার জন্য এখনো জবিরকে তাগিদ দেন। তবে জবির বলেন-“এই টেকার আশা তুই ছাইর‌্যা দে”। প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে জালাল বলেন, ওই টাকা দিয়ে মায়ের জন্য শাড়ি ও বাবার জন্য লুঙ্গি কেনার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু প্রথম উপার্জনের টাকাটা আত্মসাৎ হওয়ায় কতটা কষ্ট পেয়েছি সেটা কেউ বুঝবে না।

জালাল জানান, আমার স্বপ্ন পড়াশোনা করে শিক্ষক হবো। কিন্তু যে টাকা আয় করি সেটা সংসারেই চলে যায়। পড়াশোনার টাকাটা পাবো কোথায়? এরই মধ্যে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। জালাল বই খুলতেই এক যাত্রী রিকশায় উঠে বলে মামা স্টেশন যান দ্রুত, ট্রেন ধরবো। জালালও বই গুটিয়ে রিকশা নিয়ে ছুটে চলে গন্তব্যের দিকে।

শনিবার সকালে কিল্লা বোকাইনগর ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ছায়েদুল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শাহ জালাল আগামী বছর আলীম পরীক্ষা দিবে। সে রিকশা চালিয়ে সংসার ও পড়াশোনার খরচ যোগায়। বিষয়টি অবগত হওয়ার তাকে বিনা বেতন পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছি। আমি ব্যক্তিগতভাবেও তাকে সহযোগিতা করে আসছি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এমএস

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য