artk
২৯ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ৮:১৩ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

রাজনীতিতে অন্ধকার এবং অন্ধকারের রাজনীতি: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

| নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ০৯২৯ ঘণ্টা, শুক্রবার ১৯ অক্টোবর ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ২১৫২ ঘণ্টা, শুক্রবার ১৯ অক্টোবর ২০১৮


রাজনীতিতে অন্ধকার এবং অন্ধকারের রাজনীতি: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ - পাঠকের লেখা

আজ থেকে ৪ দশক আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতিবিদদের ওপর প্রচণ্ড আস্থা এবং নির্ভরতা ছিল। স্থানীয় কিম্বা রাষ্ট্রীয় এমনকি আন্তর্দেশীয় সমস্যার বিষয়ে সাধারণ মানুষের নির্ভরতার জায়গা ছিল রাজনীতিবিদরা, রাজনীতিবিদদের দিকনির্দেশনা, চারিত্রিক সুদৃঢ় অবস্থান, ন্যায়পরায়নতা সাধারণ মানুষের জন্য অনুকরণীয় ছিল।

স্বাধীনতার অব্যাবহিত পর থেকেই শুরু হয় রাজনীতিতে হিংসা বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসার মেরুকরণ। ধীরে ধীরে এই প্রবণতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় এবং বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি এমন এক তলানিতে এসে পৌঁছেছে যে, নতুন প্রজন্ম কখনো জানতেও পারবে না আমাদের দেশেও কোন এক সময় সুস্থ ধারার রাজনীতির চর্চা হতো।

একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করে সেই দেশের বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর। যে নেতৃত্ব হবে বিচক্ষণ, সৎ, উদ্ভাবনী চিন্তার অধিকারী এবং ন্যায়পরায়ণ।

উল্লেখিত নেতৃত্ব তৈরির জন্য প্রয়োজন উচ্চ শিক্ষিত, বুদ্ধিদীপ্ত, কর্মঠ নীতিবান, পরমত সহিষ্ণু মানসিকতাসম্পন্ন যুবক-যুবতীদের রাজনৈতিক দলে অংশগ্রহণ করে আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার তুলে নেওয়া। অথচ বর্তমান বাংলাদেশে খুব কম সংখ্যক মেধাবী যুবক-যুবতী রাজনীতিতে অংশ নিতে আগ্রহী। পক্ষান্তরে বেশিরভাগ মেধাহীনরা রাজনীতির নেতৃত্ব দখল করে আছে। যেহেতু মেধাহীনরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে তাই বেশিরভাগ সিদ্ধান্তই জনকল্যাণের পরিবর্তে জনভোগান্তিতে পর্যবসিত হয়।

মেধাহীন নেতৃত্বের মধ্যে কখনো আত্মসমালোচনা আশা করা যায় না, উপরন্ত কেউ সমালোচনা করলে তার ওপর নেমে আসে নির্মম দমন-পীড়ন। মেধাহীন স্বৈরাচারী নেতৃত্বের কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদ তছরুপের মহাউৎসব চলছে। যেহেতু তাদের কোন ধরনের জবাবদিহিতা নেই তাই যেকোন প্রকল্প বাস্তবায়নে কি উপায় বা পদ্ধতি অবলম্বন করলে রাষ্ট্র লাভবান তথা জনগণ লাভবান হবে সেই চিন্তার প্রয়োজন হয় না।

যে সকল প্রকল্প বাংলাদেশে এই পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে তার প্রত্যেকটি প্রকল্পে খরচের পরিমাণ নির্ধারিত খরচের দুই গুণের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। এর কারণ স্বেচ্ছাচারিতা, মেধাহীনতা, অনভিজ্ঞতা, যথার্থতা নিরূপনে ব্যর্থতা, সর্বাপরি দুর্নীতি এবং অসততা।

ক্ষমতাসীনদের মধ্যে যেমন মেধাবীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার খুব একটা আগ্রহ দেখা যায় না, অনুরূপভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থা আরো করুন, নির্জীব অথর্বরা নেতৃত্ব দখল করে আছে। নতুন এবং আধুনিক মানসিকতা সম্পন্নদের কোন স্থান সেখানেও নেই। দিন দিন বাংলাদেশের রাজনীতি শুধু অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার অব্যাবহিত পরেই শুরু হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানা মেরুকরণ। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিগুলির মধ্যে নেতৃত্বের কলহে এবং ব্যক্তিগত অহংকার ও জেদের কারণে শুরু হয় বিভক্তি, ফলাফল নতুন দল সৃষ্টি। সেই সময়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, আর্থসামাজিক অবস্থান, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকট, ধ্বংসিত অবকাঠামো সবকিছু মিলিয়ে এক দুঃসহ অবস্থার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল। পাশাপাশি নতুন সৃষ্ট দলগুলি তাদের অবিবেচনা প্রসূত দাবি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সকল কল্যাণমুখি পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

অপরদিকে স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তিগুলি সরকার বিরোধীদের ঘাড়ে বসে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারে লিপ্ত হয়। মহান মুক্তিযাদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেই সময়ের সরকারবিরোধী দলগুলি নিজেদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে এবং ক্ষমতার লোভে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতির মাঠে নিজেদের জনসমর্থিত দল হিসাবে প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ায় তাদের মধ্যে জন্ম নেয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য নানা প্রকারের হিংস্রতা, অসত্য তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর ঘৃণ্য প্রবৃত্তি।

সরকারের ভিতরেও অবস্থান নেয় স্বাধীনতা এবং দেশবিরোধী চক্রের অনেক কুশীলব। তারা সর্বদায় পরিকল্পনায় মশগুল থাকত কীভাবে সরকারকে বিভ্রত বা বিপদে ফেলা যায়। তারই প্রক্রিয়ায় প্রথম রাজনৈতিক আলোচিত হত্যা কমরেড সিরাজ শিখদার হত্যাকাণ্ড। ওই হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন সরকারের বা সরকারের ভিতরের মানুষদের ভূমিকা এবং অন্যকোন শক্তির সংযোগ ছিল কিনা তা আজো প্রশ্নবিদ্ধ!

এর পর পর ঘটে বাংলাদেশে সবচাইতে ভয়াবহ এবং আলোচিত সেভেন (৭) মার্ডার, এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ছিল জাগপা নেতা শফিউল আলম প্রধান। ৭৫ পরবর্তী সরকার তাকে কারামুক্ত করে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেয়, একই সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রধান এবং তার পরিবারকে সমূলে হত্যাকারীদের দায়মুক্তি এবং পুরষ্কৃত করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুন-হত্যা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু করে। সবচাইতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাতীর সকল আশা আকাঙ্খাকে পায়ে পিশে বিচারধীন স্বাধীনতা যুদ্ধে অপরাধ সৃষ্টিকারীদের মুক্তি দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে যুদ্ধপরাধীদের রাজনীতিতে পুরস্কার এবং পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক নৈরাজ্য সৃষ্টির পথ উন্মোচন করে দেয়।

শুরু হয় হত্যার রাজনীতি, ক্ষমতা বদলের স্বীকৃত পন্থার পরিবর্তে শুরু হয় বন্দুকের নলে বা রাতের অন্ধকারে অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা পরিবর্তনের সংস্কৃতি। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের এবং বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্র গণমানুষের প্রত্যাশিত আশা পূরণে আবারও ব্যর্থ হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের মেধাহীনতা, অগণতান্ত্রিক মনোভাব তথা বিরোধী শক্তিকে অবমূল্যায়ন, দুর্নীতিতে গা ভাসিয়ে দেয়া সর্বোপরি সন্ত্রাসী এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের রাজনীতিতে উচ্চাসনে স্থান দেয়ার মধ্য দিয়ে ক্রমাগতভাবে রাজনীতিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে প্রতিটি দলে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন অথবা কোননা কোনভাবে নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে বলার প্রয়োজন মনে করি না, কারণ বর্তমান বাংলাদেশের সচেতন মানুষরা তাদের সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। এই নিয়ন্ত্রকরা রাজনীতির আড়ালে সেই শক্তিকে ব্যক্তিগত এজেন্ডা প্রয়োগের মাধ্যমে স্বীয় স্বার্থ উদ্ধার করে থাকে। অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সৎ রাজনীতিবিদরা যোগ্য স্থান বা সম্মান পায় না বলে তারা নিজেদের রাজনীতি থেকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে নিচ্ছে।

সৎ নিরীহ সাধারণ মানুষ তাদের উত্তরসুরীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে স্বাগত না জানিয়ে রাজনীতি বিমুখতাকে উৎসাহিত করে। ফলশ্রুতিতে বর্তমান রাজনীতিতে যেহেতু সৎ ও নির্ভিকদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে, স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক দলেগুলির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অরাজনৈতিক দস্যুদের হাতে চলে আসছে এবং খুব সহজেই তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলছে।
এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের রাজনীতি অন্ধকারের মানুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এবং রাজনীতি ক্রমশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হচ্ছে।

লেখক: মতিউর রহমান খান, সিডনি প্রবাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

বি.দ্র: লেখাটি লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব মতামত।

নিউজবাংলাদেশে.কম/এমএস

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত