artk
২৯ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ

শিরোনাম

রূপগঞ্জের সম্ভাবনাময় জাহাজ শিল্প

মো. নুর আলম, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১০৪৯ ঘণ্টা, সোমবার ১৫ অক্টোবর ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৫২৪ ঘণ্টা, সোমবার ১৫ অক্টোবর ২০১৮


রূপগঞ্জের সম্ভাবনাময় জাহাজ শিল্প - বিশেষ সংবাদ

রাজধানীর উপকন্ঠের শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষা রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া গ্রাম। গ্রামের পথ চলতেই টাস টাস শব্দে আপনার কান ঝালাপালা হবার উপক্রম হবে। ডেমরা থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে উত্তরে কালো অজগরের মতো এঁকেবেঁকে গেছে পিচঢালা সড়ক। সেই সড়ক ধরে মাত্র তিন কিলোমিটার এগুলোই জাহাজ তৈরির অসংখ্য কারখানার দেখা মিলবে। কোনটি সবে তৈরি হচ্ছে, কোনটি সমাপ্তির পথে। যে কারো চোখ ধাঁধিয়ে যাবে বড় বড় জাহাজ দেখে।

ইতোমধ্যেই শীতলক্ষ্যা তীরের এ চরটি এখন এলাকাবাসীর কাছে জাহাজের চর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আর এ জাহাজের চরেরই গ্রাম রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া। পাঁচ বছর আগেও বন্যা কবলিত এই এলাকায় একটি পাখি ডেকে উঠলে তার শব্দ বাতাসে ভেসে যেতো দুর দুড়ান্তে । বর্ষায় নৌকা চড়ে এখানে ওখানে যেতে হতো এলাকাবাসীকে। অজপাড়াগাঁ বলতে যা বোঝায় তাই ছিল কায়েতপাড়া গ্রামটি। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য জাহাজ তৈরির কারখানা।

হাজার মানুষের পদচারণায় কায়েতপাড়া এখন এক কর্মমুখর জনপদ। কায়েতপাড়ার পূর্বগ্রাম, ভাওয়ালীয়াপাড়া, ডাক্তারখালী, বড়ালু, মাঝিনা, হরিণা, ও ইছাখালীর চরে রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক জাহাজ তৈরির কারখানা। এছাড়া উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের গঙ্গানগর ও দড়িকান্দির চরে রয়েছে আরো প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠান। দেশের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের বন্দর ও সোনারগাঁও, গাজীপুরের কালীগঞ্জ, চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, পাগলার পানগাঁও, সাভারের আশুলিয়া ও বরিবাশের বেলতা এলাকায় এই শিল্পের অবস্থান।

মাস্টাং ডকইয়ার্ড, খান ডকইয়ার্ড, ফাহিম ডকইয়ার্ড, শামস ডকইয়ার্ড, তালহা ডকইয়ার্ড, আমির ডকইয়ার্ড, মালেক ডকইয়ার্ড, ফটিক ডকইয়ার্ড, ভাই ভাই ডকইয়ার্ড, মনির ডকইয়ার্ড, মাস্টাং ইঞ্জিনিয়ারিং কায়েতপাড়ার জাহাজ কারখানাগুলোর অন্যতম।

আড়াইশ ফিট থেকে শুরু করে শত ফিটের কোস্টার বা মালবাহী জাহাজ, সরোঙ্গা, ফেরি, জেটি, পল্টন, বালুবাহী ট্রলার, ভলগেট আর ড্রেজার তৈরি হয় শীতলক্ষার এই চরে। দিনভর টানা খুটখাট আর টং ঢং শব্দে মুখরিত এলাকাতে অচেনা আগুন্তক এলে হয়তো ভাবতে পারে এলাকা জুড়ে চলছে উৎসব।

জাহাজ তৈরির পদ্ধতি

জাহাজ তৈরিতে মূলত ব্যবহার হয় লোহার প্লেনশিট আর এঙ্গেল, মেশিন সরাসরি আমদানি করতে হয় চীন থেকে। অতিরিক্ত উপাদান বলতে টি-গার্ডার, বিট-গার্ডার, রং, ইট, বালি, সিমেন্ট, গ্যাস সিলিন্ডার, অক্সিজেন, ওয়েল্ডিং রড আর লেদ মেশিনের কিছু খুচরো কাজ। একটি বড় মাপের কোস্টার জাহাজ তৈরির জন্য প্রথমে রাজমিস্ত্রি বেইস লাইন তৈরি করে দেন। পরে ঠিকাদারের নির্দেশনাক্রমে ফিটাররা জাহাজের মলিন তৈরি করেন। ওয়েল্ডার ঝালাইয়ের মাধ্যমে জাহাজটির খাঁচা তৈরি নির্মাণ করেন। একটি বডি দাঁড় করানোর পর চলে মেশিন স্থাপন আর রংয়ের কাজ। বড় জাহাজে ৩/৪টি খুপড়ি বা হেস থাকে। যেখানে ৩/৪শ টন পর্যন্ত মাল বহন করা যায়।

প্লেনশিট আসে চট্টগ্রাম থেকে। বিদেশি কাটা জাহাজের ৮ থেকে ১২ মিলির শিট ব্যবহার করা হয় জাহার তৈরিতে। ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে শিট কিনতে হয়। আর লোহার অঙ্গেল ৭৫/৭৬ টাকায় পাওয়া যায় স্থানীয় বাজারে। ৮/৯ লাখ টাকায় জাহাজের মেশিন আমদানি করা হয় চীন থেকে আর অন্যান্য মালামাল আছে ঢাকার বংশালে অথবা চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে। সর্বসাকুল্যে একটি বড় জাহাজ তৈরিতে ৯/১০ কোটি টাকা খরচ হয়। এর পর মালিকরা সুবিধেমতো লাভ করে তা বিক্রি করেন। একটি জাহাজ ২০/২৫ জন কারিগর মিলে তৈরি করলে সময় লাগে ১২ থেকে ১৫ মাস।

সম্পৃক্ততা যাদের

জাহাজ মালিকদের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। ইতিহাসের খেরোখাতা থেকে জানা যায়, ১৭৯৯ সালে ব্রিটেন দ্বিতীয় যুদ্ধজোট গঠনের পর জোট থেকে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে একটি বার্তা আসে মিত্র হিসেবে ভারতবর্ষ থেকে জাহাজ তৈরির জন্য কিছু শ্রমিক প্রেরণ করার। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সম্রাট আওরঙ্গজেব জাহাঙ্গীর নগর (ঢাকা) থেকে ৩২০ জন শ্রমিক ব্রিটেনে পাঠান। শোনা যায়, তারা বর্তমান ঢাকার দোহারের অধিবাসী ছিলেন। সেই থেকে জাহাজ তৈরি দোহারবাসীর আদি ব্যবসা। হালে কাঠের জাহাজের প্রচলন না থাকলেও বাংলাদেশে যারা জাহাজ তৈরি করেন বা জাহাজের ব্যবসা করেন তাদের অধিকাংশের বাড়ি ঢাকার দোহারে। আবার অনেকে মজা করে বলেন, ‘বাড়ি আমার দোহার, কাজ করি লোহার’।

অন্যদিকে, যারা জাহাজ তৈরির কারিগর তাদের বাড়ি দোহার, বিক্রমপুর, পিরোজপুর, রাজবাড়ির গোয়ালন্দ, আর নবাবগঞ্জে। রং এবং রাজমিস্ত্রির কাজ করেন স্থানীয়রা। জাহাজ তৈরির জন্য যিনি জমি দেন এবং বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেন তাকে বলা হয় কারখানা মালিক। আর যারা জাহাজটি ফিটিংস করেন তাদের বলা হয় ফিটার। জাহাজে ঝালাইয়ের কাজ করেন ওয়েল্ডার আর পুরো ব্যাপারটা যে নিয়ন্ত্রণ করেন সে হলো ঠিকাদার। জাহাজ তৈরির সকল উপকরণ কিনে দেন জাহাজ মালিক। জমির মালিক একটি জাহাজ ফেলার জন্য জমির ভাড়া নেন ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। একজন ঠিকাদারের মাসিক বেতন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। একজন রাজমিস্ত্রি দৈনিক হাজিরা পান ৩৫০ টাকা তার সহযোগী ২৫০ টাকা। ফিটারের দৈনিক বেতন ২০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। ওয়েল্ডার পায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা মধ্যে। রং মিস্ত্রির হাজিরা ২৫০ টাকা তাদের সহকারীদের বেতন ২০০ টাকা। আর সকল হেলপারদের দৈনিক হাজিরা ১৫০ থেকে আড়াইশ টাকার মধ্যে। সকল খরচ শেষে একটি জাহাজ পানিতে নামানোর পর জাহাজ মালিক আলোচনার ভিত্তিতে তা বিক্রি করেন।

বছরে ৪০/৫০ লাখ টাকার মতো তাদের আয় হয় বলে জানা যায়। এ ছাড়া অত্র এলাকায় শিল্পটি গড়ে উঠায় এলাকাতে বাড়ি ভাড়া, গর্দার ব্যবসা, লেদ মিশেন, খুচরো যন্ত্রাংশ আর পান/সিগারেটের দোকান দিয়ে এলাকার মানুষ বাড়তি উপার্জন করছে।

সুখ-দুঃখের সাতকাহন

কথায় বলে “দেশ ভরা যার গোলা, ভাতে মরে তার পোলা’। লোহার মতোই কঠিন কাজ করেন যে মানুষগুলো। খুব কিন্তু ভালো নেই তারা। সকলের সাথেই কথা বলে পাওয়া গেলো হতাশার সুর। লোহার মতো শক্ত সামর্থ শরীর তাদের। কিন্তু তাদের ঘরের খুঁটি অত্যন্ত দুর্বল- নড়বড়ে। জীবন জীবিকা আর বাসস্থানের মান নগন্য।

ফিটার সাঈদ, সোনাই, মোক্তার, জয়নাল ওয়েল্ডার পান্নু ও আলমাসসহ আরো অনেকে জানান, হিসেব কষে খেয়ে দেয়ে বাকি টাকাটুকু তুলে রাখেন পরিবার পরিজনদের জন্য। তারা বলেন, কাজের তুলনায় বেতন অনেক কম তার পরও করার কিছু নেই। এই কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজ তারা শিখেননি। এটাই করতে হবে তাদের।

আর জাহাজের মালিক ওসমান ঢালী, লতিফ, আনোয়ার হোসেন, কামাল, মাহফুজ, আব্দুল মজিদসহ আরো অনেকে বলেন, রোজ হাজিরা, মালামাল কেনা, বিদ্যুৎ বিল আর জমির ভাড়া এগুলোর ভেতর লুকিয়ে থাকে জাহাজের লাভ লোকসানের ব্যাপার। এ কারণে হিসেব কষে সকলকে টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া মালামালের দাম যে হারে বাড়ছে জাহাজের দাম কিন্তু আগের তুলনায় বাড়েনি।

তবে বেশ খুশি মাসটাং ডকইয়ার্ডের ম্যানেজার ফারুক আহমেদ, বাড়িওয়ালা নুরুল হুদা, জন, সাঈদ আহমেদ, হাবিব, সুমন, খোকন, আলী আকবর স্থানীয় ইউপি সদস্য শরিফসহ আরো অনেকে। তাদের এলাকায় জাহাজ শিল্প গড়ে উঠায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে এলাকার মানুষ।

জাহাজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মহব্বত হোসেন খান নয়ন জানান, ঝামেলা পাকাচ্ছে গর্দা ব্যবসায়ীরা। মাঝে মধ্যেই তারা জাহাজ মালিকদের সাথে বাতিল মালামাল কেনা নিয়ে ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়ছে। আর এলাকার আর্থিক উন্নতির কারণে অনেকে মাদকসেবন ও ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ছে। নেশার টাকা জোগাতে তারা জাহাজের যন্ত্রাংশ ও বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার অবধি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় ব্রাইট কিন্ডার গার্টেন স্কুলের সত্ত্বাধিকারী রাসেল আহমেদ জানান, আগে যেখানে অভাবের কারণে অবিভাবকরা তাদের সন্তানদের স্কুলে দিতে চাইতো না। এখন টাকা খরচ করে ভালো পড়াশোনা শেখার জন্য সন্তানদের কিন্ডার গার্টেনে ভর্তি করাচ্ছেন।

আলোর নীচে যেমন বাস করে অন্ধকার ঠিক তেমনি রাজধানীর কোলঘেঁষা এই জনপদটি ছিল অবহেলিত। বছরের অর্ধেকটা সময় জুড়ে এলাকাটি থাকতো জলমগ্ন। কৃষি নির্ভর এলাকার মানুষ বছরে মাত্র একবার ফসলের মুখ দেখার কারণে তাদের দিন কাটতো খেয়ে না খেয়ে।

হঠাৎ করেই এলাকার আব্দুল মালেক আর ফটিক খান বন্দর এলাকার সোনাকান্দায় গিয়ে দেখতে পেলেন শীতলক্ষার বুকে জেগে উঠা সামান্য চরে তৈরি হচ্ছে ট্রলার। তাদের মাথায় চিন্তা ঢুকে তারাও তাদের প্রায় পতিত চরের জমিকে এভাবে কাজে লাগাতে পারেন। ভাবনা থেকেই তারা একাধিকবার দোহারে যান। কথা বলেন জাহাজ মালিকদের সাথে। তারা সম্মত হলে ২০০৫ সালে পূর্বগ্রাম এলাকায় দুটি কারখানা চালু হয়। লাভের মুখ দেখায় একে একে গড়ে উঠলো অর্ধশত কারখানা।
আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে এলাকার মানুষ। চেয়ারম্যান খুশি তার এলাকা স্বনির্ভর হচ্ছে। কিন্তু সরকারি কিছু কাগজপত্রের অভাবে কারখানা মালিকদের মাঝে যে হতাশা তা দুর করার দায়িত্ব সরকারেরই। তাই এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে সম্ভাবনাময় শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। তবেই তো স্বনির্ভর হবে আমাদের বাংলাদেশ।

নিউজবাংলাদেশে.কম/এমএস

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য
এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত