artk
১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, বৃহস্পতিবার ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১২:১৭ অপরাহ্ন

শিরোনাম

মাছ চাষে সমৃদ্ধ হচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতি

নিউজ ডেস্ক | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১২১৮ ঘণ্টা, শুক্রবার ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ || সর্বশেষ সম্পাদনা: ১৭৫৪ ঘণ্টা, শুক্রবার ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮


মাছ চাষে সমৃদ্ধ হচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতি - ফিচার
ছবি: সংগৃহিত

মৎস্য চাষের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা ঘুরছে পার্বত্য অঞ্চলে। পাহাড়ি ছড়ার পানি আটকিয়ে মাছ চাষ ব্যবস্থাও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিছু কিছু অঞ্চলে তৈরি হয়েছে পর্যটনের সম্ভাবনা। পাহাড়ি পরিবেশে মাছ চাষের মাধ্যমে আমিষের অভাব পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড়ের মধ্যে বাঁধের পানি ব্যবহার করে বোরো চাষ, পান-বরজ, অন্যান্য সবজি ও ফলদ বাগান সৃজনের সম্ভাবনা রয়েছে।

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৎস্য চাষ উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্প মূল্যায়নে এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে।

এতে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে দরিদ্র পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এ প্রকল্পে রয়েছে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা। এখানকার নানাবিধ সমস্যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পানি সংকট যা সমাধানে প্রকল্পটি ব্যাপক ভূমিকা রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী দৈনন্দিন জীবনে নানাবিধ গৃহস্থালি কাজ ছাড়াও ক্রীকগুলোকে সুপেয় পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান দেশের পিছিয়ে পড়া জনপদগুলোর অন্যতম। দুর্গম পাহাড় আর অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এ অঞ্চলের জীবনযাত্রার উন্নয়নের পথে অন্যতম বাধা। এ অঞ্চলটি পাহাড়ি ছড়া, ক্রীক, পাহাড়ের পাদদেশের ক্রীক ও গিরিখাদ দ্বারা সমৃদ্ধ। ক্রীক বলতে বোঝায় পাহাড়ে অবস্থিত ছড়া বা ঝিরি যেখানে দুই অথবা তিনদিকে পাহাড় বা টিলা এবং অন্যদিকে খোলা। সেই খোলা অংশে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে যে জলাশয় সৃষ্টি করা হয় তাকে ক্রীক বলে।

সাধারণত ক্রীকের পানির উৎস হয়ে থাকে ঝর্ণার পানি, পাহাড়ের গা চোঁয়ানো পানি এবং বৃষ্টির পানি। এ সমস্ত খাদের একপাশ আটকে ক্রীক উন্নয়নের মাধ্যমে জলাশয় সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা একদিকে সেচের পানির চাহিদা পূরণ করছে, পাশাপাশি গৃহস্থলী পানির যোগান ও মৎস্য চাষের কাজেও ব্যবহার হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে মৎস্য উৎপাদনের উৎস হলেও আধুনিক মৎস্য চাষ প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাব এবং পুঁজির সংকটের কারণে অধিকাংশ দরিদ্র পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তা সদ্ব্যবহার করতে পারছিল না এ ছাড়াও গুণগত মানসম্পন্ন পোনার অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে সময়মত পোনা সরবরাহ না থাকায় মাছ চাষ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল।

এ অবস্থা বিবেচনায় এনে মৎস্য অধিদপ্তর ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৎস্য চাষ উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পটির প্রথম পর্যায় ২০০২ সালের জুন হতে ২০০৫ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়িত হয়। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের জানুয়ারি হতে ২০১০ মেয়াদে দ্বিতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়। তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্পটি ২০১২ সালে শুরু হয়ে জুন ২০১৭ সাল মেয়াদে ৭২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তাবয়ন করা হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ২৫টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, পার্বত্য জেলাসমূহের মৎস্য চাষ কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, পাহাড়ি জনগণের পারিবারিক আয় বৃদ্ধি এবং পুষ্টির মান উন্নয়ন।
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হেক্টর প্রতি মাছের উৎপাদন হচ্ছে ৭১৫ কোজি। যা এলাকার জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে এবং পুষ্টির মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। এসব ক্রীকে মৎস্য চাষ ছাড়াও গৃহস্থালী, ধান ও শাক-সবজি চাষে ক্রীকের পানি ব্যবহার হচ্ছে এবং হাঁস পালনও হচ্ছে। পাহাড়িদের মিশ্র চাষ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

পাহাড়ে ক্রীক তৈরি হওয়ায় শুধু মানুষই নয়, পাহাড়ি কীট-পতঙ্গ, পশু পাখিরও পানীয় জল সহজলভ্য হচ্ছে। এতে করে জীববৈচিত্র সমৃদ্ধ হচ্ছে। কাজের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এসব ক্রীক। এসব এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি, কুঁচে, কাঁকড়া, কচ্ছপ ও হাঁস চাষের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ক্রীকগুলো কোনো কোনো এলাকায় পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিন পার্বত্য জেলায় ক্রীক উন্নয়ন কাজ ইতোমধ্যেই সমাপ্ত হয়েছে ৫৩৩টি। সুফলভোগীরা দল গঠন করে ৪৩৯টি ক্রীকে মৎস্য চাষ শুরু করেছেন। তবে মৎস্য উৎপাদনের সফলতা নির্ভর করে সময়মতো পোনা প্রাপ্তির উপর। কিন্তু প্রকল্পের আওতায় হ্যাচারী ও নার্সারির কাজ শেষ না হওয়ায় মৎস্য উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে।

ক্রীক মালিক ও সুফলভোগীদের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ৯২ দশমিক ৭০ শতাংশ বলেছে তাদের দৈনিক মাছ খাওয়ার পরিমাণ ১০ বছর পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। মাত্রা ৭ দশমিক ৩ ভাগ বলেছে এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। ক্রীক মালিকদের ৯৫ দশমিক ৪০ ভাগ বলেছে তাদের মাছ খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে। বেশিরভাগ ক্রীক মালিক বলেছেন, তাদের পূর্বের চেয়ে পরিবারের নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের সক্ষমতা বেড়েছে। মৎস্য চাষের পাশাপাশি এসব ক্রীকে হাঁস পালনের কারণে উপকারভোগীদের সহায়ক আয়ও বাড়ছে। এছাড়া সবজি চাষে গুরুত্বও বাড়ছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উপজেলা মৎস্য অফিসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও নির্দেশনাতে সুফলভোগী দল গঠন করা হয়। ক্রীকের আশেপাশে বসবাসরতদের মধ্য হতে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে মৎস্য চাষে আগ্রহী ৩০ শতাংশ মহিলা সম্পৃক্ত থাকেন। সুফলভোগী দলের নিয়মিত সভাও হয়। পোনা অবমুক্তি, ক্রীক সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনাও হয়।

এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। পূর্বে ক্রীক নির্বাচিত থাকায় ক্রীক পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। কেননা অনেক ক্ষেত্রে ক্রীকের অস্তিত্ব চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম ও কষ্টকর। কোনো কোনো ক্রীকে যেতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা হাঁটতে হয় দুর্গম এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় যোগযোগ সমস্যাও রয়েছে। তাছাড়া বর্ষাকালে ক্রীকের উন্নয়ন করাও কষ্টসাধ্য। প্রকল্পের আওতায় দুইদিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু সকলকে প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা যায় না। বাসস

নিউজবাংলাদেশ.কম/এমএস

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য