artk
৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শনিবার ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৬:৫১ অপরাহ্ন

শিরোনাম

বিএনপির ‘সত্যিকারের বিরোধী দল’ হওয়া আর কতদূর!

মিঠুন রেজাউল হান্নান | নিউজবাংলাদেশ.কম
প্রকাশ: ১৮৪৩ ঘণ্টা, মঙ্গলবার ২৮ আগস্ট ২০১৮


বিএনপির ‘সত্যিকারের বিরোধী দল’ হওয়া আর কতদূর! - অসম্পাদিত

অতীতে যে কোনো সরকারের আমলেই সরকার বিরোধী যে কোনো আন্দোলনে প্রধান বিরোধী দলের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা আমরা জেনে আসছি। সেটা যে ইস্যুরই হোক না কেন প্রধান বিরোধী দলের সব সময়ই সরকার বিরোধী আন্দোলনের নিয়ামক হওয়ার দৃষ্টান্ত দৃশ্যমান ছিল।

স্বাধীনতার পর থেকেও আমরা যদি হিসাব করি তাহলে দেখবো হয়তো কোনো আন্দোলন শিক্ষার্থীরা শুরু করেছে অথবা শ্রমিকসমাজ শুরু করেছে। কোনো কোনো সময় একেবারে নিভৃত কোনো গ্রাম থেকেও আন্দোলনের সূচনা হয়েছে। কিন্তু সে আন্দোলন সূচনার পর তার সফল পরিসমাপ্তি ঘটাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও ত্যাগ স্বীকারের ইতিহাস ওই নির্দিষ্ট সময়ের বিরোধী দলগুলোর।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকারের সময় কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা পুরো জাতিকে নাড়া দিয়েছিল। যেমন- উত্তরবঙ্গে একটি মেয়েকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় তীব্র আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ওই এলাকা থেকেই। তারপর এ আন্দোলনকে জাতীয় রূপ দান করেছিল ওই সময়ের প্রধান বিরোধী দল। ওই একটি এলাকার বাসিন্দাদের আন্দোলনের আবেদনকে দেশের সমগ্র এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা ও দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলেছিল তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল।

শুধু এ ঘটনাই নয়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় সারের দাবিতে আন্দোলনে পুলিশের গুলিত কৃষক নিহত হলে সারা দেশে এর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে। সীমান্তবর্তী জেলা চাপাইনবাবগঞ্জের কানসাট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে ওই এলাকার মানুষের কণ্ঠ ও প্রতিবাদ জাতীয় রূপ লাভ করেছিল।

এটা যে কেউ স্বীকার করবেন, অন্তত অষ্টম জাতীয় সংসদের মেয়াদকাল পর্যন্ত জনবিরোধী যে কোনো সিদ্ধান্তকে জাতির সামনে পরিস্কারভাবে তুলে ধরার জন্য সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম ছিল প্রধান বিরোধীদলের কর্মকাণ্ড।

অষ্টম জাতীয় সংসদের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে অনৈক্যের সুযোগে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় দুই বছর দেশ শাসন করে। প্রধান দুই দলের শীর্ষ দুই নেত্রীসহ অনেক রাজনীতিবিদ ও অন্যান্য পেশার ব্যক্তিত্বদের কারাগারে যেতে হয়।

এই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর বাদ দিলেও নবম জাতীয় সংসদ ও চলমান দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদকালে সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিকে ভিন্ন ধরণের অবস্থায় দেখা গেছে। অন্তত দুই/তিনটি ইস্যুতে আন্দোলনের সূচনাকারীরা স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়ে বিএনপি থেকে দূরে থেকেছেন।

যেমন- রামপালে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে অনেক সংগঠন আন্দোলন করেছিল। তারা ভালো জনমতও সৃষ্টি করতে পেরেছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- এই আন্দোলনের সাথে সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না।

আন্দোলনের প্রথম দিকে বিএনপি নিশ্চুপ থাকলেও জনমত সৃষ্টি হলে দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলনের সমর্থনে সংবাদ সম্মেলন করেন। আর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাখ-ঢাক না করে প্রকাশ্যেই এ আন্দোলনে জড়িত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।

এর জবাবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধীরা প্রকাশ্যেই বলেছিলেন যে -তারা বিএনপির সাথে এক প্লাটফর্মে আন্দোলনে যাবেন না।

আরো অনেক আন্দোলনের সংগঠকদের স্পষ্টভাবে বলতে হয়েছে বা বুঝাতে হয়েছে যে তাদের আন্দোলনে বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। অনেক ইসলাম ধর্মভিত্তিক দল বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের আগে ও পরে প্রকাশ্যেই বলেছে যে বিএনপি তাদের সাথে নেই। যেমন হেফাজতে ইসলামের আমির নিজেই বিভিন্ন আয়োজনে এটা বলে আসছেন।

যুদ্ধাপরাধীদের ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে গড়ে উঠা গণজাগরণ মঞ্চের স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনের সময় বিএনপি তো কার্যত প্রতিপক্ষের ভূমিকা পালন করেছে। কারণ বিএনপি এবং তার রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতের অনেক নেতার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার চলমান ছিল। যাদের মধ্যে অনেকের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। অনেকের বিচার চলমান রয়েছে।

অন্যান্য নেতাদের কথা বাদ দিলাম, খোদ বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নিজেই প্রকাশ্যে এ আন্দোলন সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে এমন অনেকের মুক্তিও চেয়েছিলেন তিনি। এর জবাবে গণজাগরণ মঞ্চ থেকে বক্তব্য দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়ক এবং সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটার সংস্কার চেয়ে আন্দোলন করেছে। এসব আন্দোলনে সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপিকে দূরে রাখার এক নতুন চিত্র দেখা গেছে।

এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে কোটা সংস্কারের দাবিতে শাহবাগ চত্বরে অবস্থান নেয়া হাজারো তরুণ-তরুণীর হাতে ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি। তাদের স্লোগান ছিল এরকম- ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’; ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, কোটা বৈষম্যের ঠাঁই নাই’; ‘শেখ হাসিনার বাংলায়, কোটা বৈষম্যের ঠাঁই নাই’।

যে বাংলাদেশে নিরপেক্ষতা প্রমাণের জন্য সুশীল সমাজ বা অন্যান্য পেশাজীবিদের অনেক সাবধানে শব্দ চয়ন করতে দেখা গেছে, সেখানে অরাজনৈতিক তরুণ-তরুণীরা নিঃসংকোচে এ স্লোগান উচ্চারণ করেছে। যা একটি রাজনৈতিক দল ব্যবহার করে। অর্থ্যাৎ, এ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেও সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির অস্তিত্ব নেই। নিয়ম রক্ষার একটি সংবাদ সম্মেলন ছাড়া আর কোনো ভূমিকারও ছিল না।

সার্বিক বিচারে বিএনপির এ অবস্থা বিশ্লেষণ করলে বা কারণ খুঁজতে গেলে হয়তো অনেক কিছুই বলা যাবে। কেউ বলতে পারেন অধিকার আদায়ে উপযুক্ত ভূমিকা রাখার মতো সক্ষমতা বিএনপির আছে কিনা এ বিষয়ে সব সমাজের মানুষের সন্দেহ আছে। আবার অনেকে বলতে পারেন জামায়াতের রাজনৈতিক মিত্র হওয়ার কারণে ভাবমূর্তি সংকটে পড়ার ভয়ে কেউ বিএনপির সঙ্গে কেউ একাত্ম হতে চায় না।

কারণ যা-ই হোক, প্রধান বিরোধী দলের এই অবস্থা দেশের মানুষের জন্য এবং গণতন্ত্রের জন্য হতাশাজনক। হতে পারে বিএনপি এখন সংসদে নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ করার মতো একমাত্র দলের নাম হলো বিএনপি। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে দেখতে চায়। আওয়ামী লীগের সময় বিএনপির প্রতিও সমান প্রত্যাশা।

প্রধান বিরোধী দলকে গণতন্ত্রের পাহারাদার বলা হয়। নিজেদের দেশপ্রেম ও জনগণের চাহিদা বুঝার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে না পারলে সঠিক পাহারাদার হওয়া যায় না। আর জনগণের উপযুক্ত পাহারাদার না হয়ে শুধু সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে এতদিন ক্ষমতায় আসা গেলেও এখন হয়তো সেটাও পারা যাবে না।

সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে কোনো কিছু এড়িয়ে না গিয়ে অতীতের সব ভুল স্বীকার করতে হবে। ভুল সংশোধনে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি জনগণের চাহিদা যথাযথভাবে অনুধাবন ও তা বাস্তবায়নে উপযুক্ত পরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে। নিজেরা কোনো অন্যায়ে না জড়িয়ে সরকারের সব অন্যায় জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। স্বাধীনতা বিরোধী, সুবিধাবাদী, দলবদলকারী ও অপরাধীদের বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ দেশপ্রেমের আঙ্গিকে দল এবং জোট পুনর্গঠন করে দেশবাসীর সামনে তাদের পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারলে বিএনপির জন্য ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হতে পারে।

আর বিএনপির এ ঘুরে দাঁড়ানো আওয়ামী লীগের উপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিবাচক পরিবর্তন দারুনভাবে প্রভাবিত করবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে। যে পরিবর্তনের জন্য প্রতিবার স্বপ্ন দেখে প্রায় প্রতিবারই স্বপ্নভঙ্গের স্বাদ পেয়েছে এ দেশের মানুষ।

লেখক- সাংবাদিক।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এএইচকে

নিউজবাংলাদেশ.কমে প্রকাশিত যে কোনও প্রতিবেদন, ছবি, লেখা, রেখাচিত্র, ভিডিও-অডিও ক্লিপ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনও মাধ্যমে প্রকাশ, প্রচার করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।
আপনার মন্তব্য